বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৬

বোকা বায়েজিদ, লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন, অনুবাদ : আবীর চৌধুরী

          বোকা বায়েজিদ
এক ছিল ছেলে। নাম বায়েজিদ। 
বায়েজিদের মা ছাড়া আর কেউ ছিল না। বাবা মারা গেছেন ছোট বেলায়। একমাত্র সন্তান বায়েজিদকে নিয়ে মা কুড়ে ঘরে থাকেন।
বায়েজিদ ছিল মায়ের খুব ভক্ত। মাকে খুব শ্রদ্ধা করত। মাও বায়েজিদকে ভালবসতেন। মায়ের স্নেহে বায়েজিদ আর বায়েজিদের শ্রদ্ধায় সুখে চলছিল তাদের সংসার। ।
বায়েজিদ মক্তবে পড়ে। তখনকার দিনে ইরাক ছিল অত্যন্ত পশ্চাদপদ এলাকা। আধুনিক শিক্ষার কোনো ছোঁয়া পড়েনি। ষষ্ঠ শতকের ধর্মীয় মিথই ছিল মূল শিক্ষা। বায়েজিদ অত্যন্ত বুদ্ধিমান হলেও গোড়ামীপূর্ণ শিক্ষা তার জ্ঞানকে বিকাশ হতে দিচ্ছিল না।
আকাশের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে হতবাক হয়ে যেত বায়েজিদ। যখন মক্তবে পড়ত তখন আকাশ দেখে অবাক হয়ে যেত। হুজুর বলত, আকাশ পৃথিবীর ছাদ। তখন আর অবাক হত না। ছাদ স্বাভাবিক জিনিস। তাদের ঘরেও ছাদ আছে। তাহলে বৃষ্টি পড়ে কেন? 
ছাদ কী ফুটো?
এ সব মা শুনলে ধমক দেন। 
মা বলেছেন : মক্তবে যা পড়া হবে তা ছাড়া আর কোনো জ্ঞান নেই। হুজুর যা বলেন তা-ই সবকিছু। সে হতে বায়েজিদ আর কিছু ভাবে না। কোরআন পড়ান হুজুর, হাদিস পড়েন। এগুলো ছাড়া আর কোনো কিছুতে তার বিশ্বাস নেই। বয়েজিদ বিশ্বাস করেন আসামান পৃথিবীর ছাদ। সুর্য সন্ধ্যাবেলা কাদামাখা একটা গর্তে ডুবে যায়। হুজুর বলেছেন, কোরআন থেকে।
মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। এটি খুব বিশ্বাস করে শিশু বায়েজিদ। না করে উপায় নেই। মায়ের কথা না শুনলে মা খুব মারেন। এ মারটাই জাহান্নাম। আর মায়ের কথা শুনলে মা খুব আদর করেন। এটিই বেহেশত। তবে বায়েজিদের মায়ের সকল কথা শুনতে ইচ্ছা করে না। মাঝে মাঝে মায়ের অবাধ্য হতে চায় মন। কিন্তু মায়ের কথা শুনতে হয়। না শুনলে মারেন। খুব মারেন। বাবা যখন ছিলেন বাধা দিতেন মাকে। এখন মারলে কেউ বাধা দেওয়ার নেই। হাতের কাছে যা পান তা দিয়ে মারেন। 
সারাদিন মায়ের বকাবকির জন্য বায়েজিদ ভালভাবে পড়তে পারে না। রাতে মা ঘুমোলে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশুনা করে। পড়াশুনার প্রতি বায়েজিদের খুব ঝোক। এক সময় ইচ্ছা ছিল সোহরাব-রুস্তমের মত বীর হবে। বীর হতে হলে শক্তি লাগে। শরীর লাগে। বায়েজিদের শরীর নেই। মা-বাবার মত হালকা-পাতলা। ওই শরীর নিয়ে সোহরাব-রুস্তম হওয়া যাবে না। তাছাড়া, হুজুর বলেছেন : সোহরাব রুস্তম অগ্নি-উপাসক ছিলেন। তারা মুসলিম বীর নন।
বায়েজিদের বাবা ছিলেন শিক্ষক। তিনি মক্তবে পড়াতেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। বায়েজিদকে খুব ভালবাসতেন। দশ গায়ের লোক তাকে শ্রদ্ধা করত। কিন্তু মা ঘৃণা করতেন। মায়ের অত্যাচারে বায়েজিদের পিতা অসুস্থ হয়ে মারা যান। তখন বায়েজিদ আরও ছোট ছিল। সে দিনের কথা মনে পড়লে বায়েজিদ আরও কুকড়ে যায়। যদি তাকেও বাবার মতো মেরে ফেলেন।
বয়েজিদের বাঁচতে ইচ্ছা। খুব ইচ্ছে হয় বাঁচতে। পৃথিবীটা বড় সুন্দর। বায়েজিদের শিশুমন পৃথিবীটাকে খুব শিশু করে দেখে। যত দেখে তত বিস্মিত হয়। কত প্রশ্ন চারিদিকে, কিন্তু প্রশ্ন করলে মা আর হুজুর গলা চেপে ধরেন।
পড়ায় মগ্ন বায়েজিদ মায়ের ডাকে চমকে উঠে। এত রাতে মা খুব একটা ডাকেন না। তিনি খুব ঘুম প্রিয়। ঘুমোলে আর উঠতে চান না। বায়েজিদ মাকে ডাকে না। ভোরে উঠে নিজেই নিজের খাবার তৈরি করে। নিজেই খেয়ে মক্তবে চলে যায়। মাকে ডাকলে মায়ের ঘুম ভেঙে যাবে। কাঁচা ঘুম ভাঙলে মা পাকা কাঁটার মত হুল ফুটান। এরপর হতে আর ডাকে না। মা ঘুম হতে যখন উঠে তখন বায়েজিদ মক্তবে। উঠে বায়েজিদের রান্না করা খাবার খেয়ে আবার শুয়ে পড়েন। বায়েজিদের মা বায়েজিদকে দোয়া করেন : আমার ছেলেটা আমাকে রান্না করে খাওয়ায়। আল্লাহ তুমিও তাকে রান্না করে খাইয়ে দিও।
আবার শব্দ আসে মায়ের ঘর হতে: পানি।
বায়েজিদ দৌড়ে যায় মায়ের বিছানার কাছে: কী হয়েছে আম্মিজান?
ভারি পিপাসা পেয়েছে। পানি দাও।
বায়েজিদ মগ নিয়ে কলসির কাছে যায়। কলসি খালি। এক ফোটা জলও নেই। এখন উপায়?
বায়েজিদ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখনকার দিনে এখনকার মতো নলকূপ ছিল না। নদী, দীঘি ও পুকুরের পানি পান করত। অবশ্য তখন এ পানি ছিল বিশুদ্ধ। এখন মানুষের অত্যাচারে নদী-পুকুরের পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে।
বায়েজিদের বাড়ির কাছাকাছি কোনো জলাধার ছিল না। কিছুটা দূরে একটা দীঘি ছিল। বায়েজিদ মগ নিয়ে পানি আনতে বের হয়। পানি নিয়ে বাড়ি আসে। মায়ের শিয়রের কাছে গিয়ে ডাক দেয় বায়েজিদ : আম্মিজান পানি নিয়ে এসেছি।
মায়ের কোনো সাড়া পায় না।
আবার ডাক দেয় বায়েজিদ : আম্মিজান, পানি।
কোনো শব্দ নেই। বায়েজিদ ভাবে মা ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন কী করা যায়? মা-তো যে কোনো সময় জেগে আবার পানি চাইতে পারেন। সুতরাং কোথাও না-গিয়ে বায়েজিদ মায়ের শিয়রের কাছে পানির মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সকাল বেলা ঘুম ভাঙে মায়ের। বায়েজিদকে মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রেগে একসার: এভাবে দাড়িয়ে আছো কেন?
রাতে আপনি পানি চেয়েছিলেন। কলসিতে পানি ছিল না। দীঘি হতে এনেছি। এসে দেখি আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। যদি আবার পানি চান তাই দাড়িয়েছিলাম।
মা বললেন : তুমি কাজটা মোটেও ভাল করোনি। মনে মনে ভাবছো আমি খুশি হব। মোটেও না। তুমি যদি আমাকে ভালবাসতে তাহলে ডেকে পানি খাইয়ে দিতে। আমি তো মরেও যেতে পারতাম। আমাকে যদি ডাকতে, তাহলে আমি পানি খেয়ে শান্তিতে ঘুমোতে পড়তাম। আর বেহুশ হয়ে গেলে কবিরাজ নিয়ে আসতে পারতে। তোমাকে দিয়ে আমার হবে না। তুমি আমাকে পানি না-খাইয়ে মেরে ফেলতে চাইছ। যাতে আমি মরলে শান্তিতে থাকতে পার। তুমি তোমার বাপের মতো হারামজাদা হয়েছ।
বায়েজিদ : আমি ভয় পেয়েছিলাম। যদি আপনি জেগে উঠেন।
মা : বুঝলে যখন আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তাহলে তুমি মগটা রেখে পড়ার টেবিলে গিয়ে পড়তে পারতে। আমি ডাকলে আবার আসতে।  পড়া ফাঁকি দেওয়ার ফন্দি, আমাকে এসব শেখাতে এসো না। মোমবাতি নিভিয়েছিলে?
না, বলেই দৌড় দেয় বায়েজিদ। গিয়ে দেখে মোম জ্বলে তার সখের টেবিল ও পাশে রাখা বইটা পুড়ে গেছে। হায় হায় এখন কী হবে! মা দেখলে তো আস্ত রাখবে না। এখনও টেবিল হতে ধোয়া আসছে।
পেছনে তাকিয়ে দেখে মা : হারামির বাচ্চা, এ সব কী করলে? তোর জন্ম আমাকে শেষ করার জন্য। তুই না থাকলে আমি আর একটা বিয়ে করে সংসার করতে পারতাম। এত দামি টেবিলটা নষ্ট করলে, বইটা পুড়িয়ে দিলে। না পড়ার জন্য তুমি এসব ইচ্ছা  করে করেছ।
বায়েজিদ ভয়ে টকটক করে কাঁপছে : মা আমি আপনার তৃষ্ণার কথা শুনে সব কিছু ভুলে গিয়েছিলাম।
যাও। কলসি হতে জল নিয়ে এসো। আমি ওজু করব।
কলসিতে তো জল নেই।
তুমি না বললে দীঘি হতে জল এনেছো।
আমি মগ নিয়ে গিয়েছিলাম।
তুমি কলসিটা নিয়ে যেতে পারতে। তাহলে এখন আমাকে ওজু করার জন্য এতদূর যেতে হত না।
বায়েজিদ সারা রাত মায়ের শিয়রে দাড়িয়েছিল। ঘুমোতে পারেনি। ঘুমে চোখ বুজে আসেছ। দাঁড়িয়ে থাকায় পা ব্যথা করছে। আর দাঁড়াতে পারছিল না। মায়ের সামেন পড়ে যায় মেঝে। 
মা দৌড়ে আসেন : হারামির পুত। তোর বাপ মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। আমাকে প্রতিদিন মারছে। আমি আর পারছি না। এখন তো তুই মক্তবেও যেতে পারবি না। এ রকম বোকা ছেলে নিয়ে আমি কী করবো গো।
চিৎকার দিয়ে সুরে সুরে কাঁদতে শুরু করে বায়েজিদের মা : এ বোকা বায়েজিদকে নিয়ে আমি কী করবো গো খোদা। ও  খোদা তুমি এমন ছেলেটাকে কেন আমার পেটে পাঠলো গো। এত বড় ছেলে থাকতে আমাকে এক কলসি পানি এনে দিতে পারে না রে খোদা।
বায়েজিদ মায়ের চিৎকারের খবর জানে। সারাদিন আর থামবে না। ঘুমানো, খাওয়া পড়া সব শেষ। বিষন্ন বায়েজিদ নিজে নিজে উঠে পড়ার ঘর হতে কোরআন আর হাদিস গ্রন্থটা বের করে মক্তবের উদ্দেশ্যে চলে যায়। 
ভাগ্যিস এগুলো পড়ার টেবিলে ছিল না।

1 টি মন্তব্য: