রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৬

ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ (আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের জবানিতে) স্বাধীনতা যুদ্ধের জীবন্ত দলিল / সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

‘ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ’ বইটা একনাগাড়ে পড়ে  শেষ করলাম। আসলে শেষ না করে উঠতে পারছিলাম না। ভালো লেগেছে তা বলাই বাহুল্য। এত ভালো লেগেছে যে, পড়তে  বইটা আমার চেতনায় স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধ সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। পড়তে
ড. মোহাম্মদ আমীন
পড়তে প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। তাই পাঠ শেষ করে কিছু আলোচনা লিখতে বসে যেতে বাধ্য হই। বইয়ের নায়ক সুবেদার মেজর আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের লড়াই নিশ্চিতভাবে এক গৌরবজনক অধ্যায়। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর এবং তাঁর মতো আরও অনেকের একাগ্র ও অকুতোভয় ভূমিকা আমাদের দিয়েছে মহান স্বাধীনতা। বিশেষ করে আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের সাহস, যুদ্ধকৌশল, দেশপ্রেম, পরিবার-পরিজনের প্রতি অগাধ দরদ, দেশের শত্রুর প্রতি বজ্রকঠোর অবস্থান ও মানবতাবোধ সত্যি মুগ্ধকর।
বইয়ে তেতুলিয়া নামের একটি জায়গার উল্লেখ পেলাম। আমারও যুদ্ধ করি তেতুলিয়া
অঞ্চল জুড়ে। তবে এ তেতুলিয়া আলাদা, এটা নাভারণ ও সাতক্ষীরার মধ্যবর্তী অঞ্চল। এখানকার লড়াইয়ের পরিবেশটিও ছিল আলাদা। এখানকার ইপিআর যারা ছিলেন, তারা কখনও বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে কোনো হামলায় (রেইডে) অংশ নিতেন না। তারা আমাদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) পাঠাতেন। মোট পাঁচটি অভিযানে আমি ও আমার নিকট বন্ধুরা সক্রিয় অংশ নিয়েছিলাম। যার চারটিতে নিশ্চিতভাবে সফল হই।বাকিটায় আমাদের সাংঘাতিকভাবে ক্ষতি হয়। কজন মারা যান, তাও কোনোদিন জানতে পারিনি। সম্ভবত কয়েকজন পালিয়ে চলে যান- যারা ক্যাম্পে রিপোর্ট করেননি। কয়েকজন মারাও যান। একমাত্র আমি পালিয়ে এসে ক্যাম্পে রিপোর্ট করি। ঘটনার পর আমাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ‘আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের জবানিতে ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ’ বইটি পড়ে শেষ করার পর মনে হলো- একটা যুদ্ধের সিনেমা দেখা শেষ হয়েছে। সিনেমা নয়, যেন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধে অংশ না নিয়েও আপিন চমৎকারভাবে যুদ্ধের ছবি এঁকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের এমন চমৎকার ও প্রত্যক্ষদর্শীর মতো নির্ঝর বর্ণনাসম্বলিত আর কোনো বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
যুদ্ধ সবসময় উভয়পক্ষ জয়ের জন্য করে। আমরা বাঙালি, তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা
আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক পদক নিচ্ছেন
ছিল আমাদের জীবনের চেয়েও বড়। এজন্য আমরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে সর্বদা প্রস্তুত ছিলাম। তবে মেজর, তার স্ত্রী ও শিশুপুত্রের হত্যার ঘটনা মনকে সাংঘাতিকভাবে আড়ষ্ট করে দিয়েছে, মেনে নিতে পারছি না। এটি আবারও প্রমাণ করেছে, যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া সবার জন্য সবসময় ক্ষতিকর। এ একটি ঘটনা, বইয়ে আলোচিত সব আনন্দঘন ঘটনাকে ছাপিয়ে মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। যদিও আমি তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। তারাই আমাদের সহযোদ্ধাদের হত্যা করেছে। অন্যায় যুদ্ধ আমরা যেন আর না করি। দুপক্ষই যুদ্ধের ব্যাকরণ ভাঙলে হানাদার আর মুক্তিযোদ্ধার পার্থক্য থাকে না। আপনার বইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে একটি জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।
লেখক সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস একজন মুক্তিযোদ্ধা, দলিত আন্দোলনের নেতা।বাংলাদেশের যশোর জেলার মশিয়াহাটি গ্রামে বিশ বছর পর্যন্ত ছিলেন।  এখান বাস করেন ভারত। তার বর্তমান ঠিকানা: নতুন পল্লী, ডাকঘর : মছলন্দপুর, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন