রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৬

হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত / শাহজাদা শামস ইবনে শফিক

হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখকের আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। হাতিয়ার ইতিহাস লিখে, লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল অ্যাসোশিয়েশন এর  সম্মাননা। আমরা জানি, হাতিয়া বাংলাদেশের একটি দ্বীপ-উপজেলা। একসময় এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নানা শাসকের উত্থান-পতন, পর্যটকদের আগমন-বহির্গমন প্রভৃতি বিষয়ের মূলভূমি ছিল হাতিয়া বা প্রাক্তর সাগরদ্বীপ বা
সাগরদি। এ হাতিয়ার ইতিহাস লিখেছেন ড. মোহাম্মদ আমীন। হাতিয়া অতি প্রাচীন জনপদ, ড. আমীনের মতে প্রায় ৬ হাজার বছর। এমন একটি প্রাচীন জনপদের ইতিহাস এতদিন কেউ রচনা করেননি, এটি ছিল সত্যি দুঃখজনক। কেন জনাব আমীন হাতিয়ার ইতিহাস রচনা উদ্যোগী হলেন সেটি ‘তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থ’ এর ভূমিকা পড়ে কিছুটা জানা যায়। তিনি লিখেছেন : - -  ১৯৯৭ খ্রিস্টব্দে দ্বীপায়ণ, ১২-তম সংখ্যার সম্পাদক, হাতিয়া জনকল্যাণ সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক ও তরুণ লেখক জনাব মো: নাজিম উদ্দিন তাঁর লেখা প্রবন্ধ ‘হাতিয়ার ভাষা ও মুসলিম আদি বসতি’ প্রবন্ধের উপসংহারে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় হাতিয়ার ইতিহাস রচনার জন্য অনাগত কাউকে উদাত্ত আহবান জানানোর পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এ আহবানের আন্তরিকতা ও আবেগময় ক্লেশ আমার মনে দাগ কাটে। হাতিয়াবাসী না হই, বাংলাদেশি তো বটে। লেখালেখি আমার সখ জানতে পেরে হাতিয়া উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চেয়ারম্যানবৃন্দ ২০০০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে আমার অফিসে এসে হাতিয়ার উপর একটি গ্রন্থ লেখার অনুরোধ করে। নাজিমের আহবান এবং চেয়ারম্যান বৃন্দের অনুরোধের স্বতঃস্ফুর্ত আন্তরিকতায় উদ্বেল হয়ে উঠে আমার সখ এবং অবসর কাটানোর মৌনতা। এমন সুযোগ ছাড়ে কে?

 ড. মোহাম্মদ আমীন উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন ‘তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ শিরোনাম দিয়ে হাতিয়ার ইতিহাস লিখেন। আঞ্চলিক ইতিহাসের অগ্রায়নে এটি ছিল একটি অমূল্য সংযোজন। অপূর্ব সুন্দর হাতিয়ার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে জনাব আমীন হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন : ~চাকুরী সুবাদে হাতিয়া, নইলে হাতিয়ার মতো এত সুস্মিত দ্বীপ-খন্ডটি ও তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অন্তরালিত   ইতিহাসের স্মারকটি  আমার চেনাই হতো না কোনদিন, ঠিক যেমন চেনা বা দেখা সম্ভব হচ্ছে  না দেশের আরও অনেক নয়নাভিরাম প্রত্যন্ত এলাকা। হাতিয়া এসেই আমি অবাক, এ শুধু ভূখন্ড নয়, ভূ-স্বর্গ, বিস্ময়ের অপার মৌনতায় পরিপূর্ণ অবকাশের মনলোভা সোহাগ, মাখনের মত সোঁদা সোঁদা গন্ধে তুলতুলে অতুল। মুহূর্তের ক্ষণগুলো যুগ যুগ জিইয়ে রাখা জলের মাঝে ভাসমান একটি প্রমোদতরী যেন। স্বপ্ন বিলাসের অত্যুত্তম নিদাঘ হয়ে ডাকছে, “এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে --। আমি এলাম”। ড. মোহাম্মদ আমীন একজন অসাধারণ ইতিহাস রচয়িতা। আঞ্চলিক ইতিহাসে তিনি যেমন নিগুঢ় তেমনি বিচক্ষণ। নামকরণের মাধ্যমে কীভাবে প্রকৃত ইতিহাসকে টেনে তুলে আনা যায় আবার কীভাবে ইতিহাসের মাধ্যমে নামকরণ বৃত্তান্তকে স্পষ্ঠীকরণ করা যায়- তা, তাঁর ইতিহাসবিষয়ক বইগুলো না-পড়লে বোঝা যাবে না। এ ইতিহাস গ্রন্থটি রচনার জন্য তিনি
পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার। আঞ্চলিক ইতিহাসে অসামান্য অবদানের জন্য ইউরোপের মেসেডোনিয়া হতে তাকে দেওয়া হয়েছে সম্মান। তিনি হাতিয়ার ইতিহাস রচনার জন্য “ হেরিডোটাসা ফাদার অব দ্যা হিস্ট্রি অ্যাওয়ার্ড/২০১৫” অর্জন করেছেন। তাঁর অন্যান্য আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থের মধ্যে ‘বাংলাদেশের জেলা উপজেলা ও নদনদীর নামকরণের ইতিহাস, চকরিয়ার ইতিহাস, ভেদরগঞ্জের ইতিহাস, অভয়নগরের ইতিহাস, অভয়নগর প্রোফাইল, কক্সবাজারের ইতিহাস, চন্দনাইশের ইতিহাস  প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।  বিশেষ করে হাতিয়ার ইতিহাস লিখে তিনি দ্রুতভাঙ্গনশীল হাতিয়াকে প্রকৃত অর্থে চিরদিনের জন্য স্থায়ী করে রেখে গিয়েছেন। তিনি ওই ইতিহাস না-লিখলে হয়তো এখনও হাতিয়ার ইতিহাস লেখা হতো কিনা সন্দেহ। এভাবে হয়তো হাতিয়া হারিয়ে যেত অনেক জনপদের ন্যায় জলের তলে। হাতিয়ার উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন ড. মোহাম্মদ আমীন গ্রন্থটি রচনা করেন। এটি হাতিয়ার উপর লেখা প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ এবং একমাত্র ইতিহাস।

ইতিহাস বলা হলেও এ গ্রন্থে রয়েছে নৃতত্ত্ব, জনমিতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রশাসন, ভূপ্রকৃতি, নামকরণসহ আরও নানা বিবরণ। প্রতিটি বিবরণ তথ্যসমৃদ্ধ এবং সর্বজনীন হিসাবে ইতোমধে স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এমন একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করায় ড. আমীন সম্মানজনক এ পুরস্কার লাভ করেন। ড. আমীনের হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব ও রেক্টর, বিপিএটিসি বলেন,  “তিলোত্তমা হাতিয়া’ যিনি লিখেত পারেন তার পক্ষে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করা অসম্ভব নয়। তার জন্য আমি গর্ববোধ করি।”  
বইটির প্রকাশক হাতিয়া জনকল্যাণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষনা ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম। এমন একটি বই প্রকাশ করায় হাতিয়া জনকল্যাণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম নিশ্চয় গ্রন্থের মতো কালজয়ী হয়ে থাকবে।

আলোচ্য ব্লগের লেখক : শাহজাদা শামস ইবনে শফিক, সম্পাদক, সাপ্তাহিক দিগন্ত ধারা ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন