বাংলা সাহিত্যে প্রশাসক / ড. মোহাম্মদ আমীন
বাংলা সাহিত্যে যাঁরা কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিখ্যাত হয়েছেন তাদের সিংহভাগই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রশাসকের কাছ থেকে। হোক তিনি নিজে, আত্মীয় বা অন্য কেউ। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি উপাধি পেয়েছেন, অর্জন করেছেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। এ সাফল্যের ক্ষেত্রটা যাঁরা সৃষ্টি করেছেন তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা আইসিএস অফিসার সত্যেন্দনাথ ঠাকুর। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ আইসিএস অফিসার যথাক্রমে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রমেশচন্দ্র দত্ত, বিহারীলাল গুপ্ত, সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়- সবাই লিখতেন। তন্মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রমেশচন্দ্র দত্ত ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় হয়ে উঠেছিলেন কালজয়ী লেখক। উপমহাদেশের প্রথম আইসিএস অফিসার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দের ১ জুন কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন দ্বেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র এবং প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ। উপমহাদেশের দ্বিতীয় আইসিএস রমেশচন্দ্র দত্ত। ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট, অর্থনীতিবিদ, ভাষাবিদ, রাজনীতিক, ইতিহাসবেত্তা, লেখক ও রামায়ণ-মহাভারতের সফল অনুবাদক। সম্ভ্রান্ত বাঙ্গালি হিন্দু পরিবারের সন্তান রমেশচন্দ্র দত্ত সাধারণ্যে আর সি দত্ত নামে পরিচিত। তাঁর পিতা পিতা ঈশানচন্দ্র দত্ত ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।
শৈলবালা দাস ভারতের প্রথম মহিলা অবৈতনিক ম্যজিস্ট্রেট। তিনিও সাহিত্যকর্মে জড়িত ছিলেন। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পিতা হরিহর বন্দোপাধ্যায় ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক হয়ে উঠার পেছনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতার অসামান্য অবদান ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের বড় ভাই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁদের পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হুগলির ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করেন। বঙ্কিমের আর এক ভাই পূর্ণচন্দ্র ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছোটগল্পকার। নবীনচন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রমেশচন্দ্র দত্ত, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী প্রমুখ ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চাকরি জীবনে যারা শুধু সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের সঙ্গে যারা সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্যকর্ম করেছেন তাদের এক পাল্লায় পরিমাপ করা উচিত নয়। দেশ ও জাতিগঠনে একজন সাধারণ প্রশাসকের চেয়ে একজন সাহিত্যিক প্রশাসকের অবদান যে কোনও বিবেচনায় অনেক বেশি। একজন বঙ্কিমের সঙ্গে বঙ্গদেশের সকল প্রশাসক যুক্ত করলেও তুলনা করা ধৃষ্ঠতা হবে। অনেক প্রশাসক বলে থাকেন; সারাদিন পরিশ্রম করার পর সাহিত্যকর্ম করার সুযোগ থাকে না। তাহলে সাহিত্যিক প্রশাসকগণ কীভাবে সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত থাকেন? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দুই স্নাতকের একজন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি পরবর্তী জীবনে সাহিত্যসম্রাট উপাধি নিয়ে কালজয়ী হয়ে আছেন। বহুভাষাবিদ প-িত হরিনাথ দে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করে কলোনিয়াল সার্ভিসের সদস্য হিসেবে সিংহলের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগ দেন। তিনি মোট ১৪টি ভাষায় এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং প্রতিটি ভাষায় গৃহীত পরীক্ষায় ফল ছিল ঈর্ষণীয়। তাঁকে ভারতবের্ষ ভাষাতত্ত্ব শিক্ষা বিজ্ঞানের পথিকৃৎ বলা হয়। তিনি ইউরোপের ২০টি ভাষায় এবং ভারতবর্ষের ১৪টি ভাষায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং অনর্গল বলতে পারতেন। ইংরেজি ভাষায় অসাধারণ দক্ষতাঁর জন্য তিনি ১ লক্ষ টাকা মূল্যমানের স্কিট বৃত্তিলাভ করেছিলেন।
১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফের্রুয়ারি বেঙ্গল একাডেমি অব লিটারেচারের নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ রাখা হয়। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন আইসিএস অফিসার রমেশচন্দ্র দত্ত এবং সম্পাদক ছিলেন আর এক সিভিল সার্ভেন্ট নবীনচন্দ্র সেন। এ কমিটির সহসভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রাদেশিক পূর্ববাংলা সরকার ‘বাংলা একাডেমী’ গঠনের জন্য একটি প্রস্তুত-কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটির সদস্য ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সিভিল সার্ভেন্ট মোহাম্মদ বরকতুল্লা। সরকারের স্পেশাল অফিসার হিসেবে তিনি বর্ধমান হাউসে বর্তমান বাংলা একাডেমির মূল রূপকার হিসেবে খ্যাত।
ঊনবিংশ শতকে বাংলার নবজাগরনের অন্যতম পথিকৃৎ প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩) দীর্ঘদিন কলকাতা মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। বিখ্যাত কবি ও শিশু সাহিত্যিক ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) আইজি প্রিজন অফিস এবং সিভিল সাপ্লাই অফিসে কয়েক বছর চাকরি করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বেতারের স্টাফ রাইটার পদে যোগ দেন। বাঙালি হিন্দুর দেশাত্ববোধের চেতনা সর্বপ্রথম প্রশাসক নবীনচন্দ্র সেন এর রচনাতেই প্রত্যক্ষভাবে বাঙময় হয়। তিনিই প্রথম বাংলাদেশের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে স্বাজাত্যবোধকে সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করেন। নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর যুদ্ধ আধুনিক বাংলা কাব্যের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও অভিনব সংযোজন। তিনিই প্রথম বাংলার কলঙ্ক, বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনীর সঙ্গে বাংলার শেষ নবাবের পতনের কাহিনী নিয়ে কাব্য রচনা করেন। এটি বাংলা ভাষায় রচিত বাঙালি জাতির প্রথম সমরসঙ্গীত।
নাট্যকার ও হাস্য-রসিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে দীনবন্ধুর একটি নিজস্ব স্থান আছে, যেখানে তাঁর সমকক্ষ আর কেউ নেই। তিনি বাংলা সাহিত্যের দুই একজন শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের অন্যতম। ড. অজিতকুমার ঘোষের মতে তিনি বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার অগ্রদূত। তিনি বাংলা সাহিত্যেরর প্রধান বাস্তববাদী লেখক। দীনবন্ধুর প্রহসন অভিনয়ের মাধ্যমে কলকাতায় ‘ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে জন্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাকে ‘রঙ্গলালয়-স্রষ্টা’ নামে অভিহিত করেছেন।স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে প্রকাশ্য সভায় যোগদানকারী অন্যতম মহিলা। প্রশাসক ভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেরণায় সাহিত্য কর্মে মনোনিবেশ করেন।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) তাঁর স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেন ছিলে উর্দুভাষী, একজন ডেপুটি মেজিস্ট্রেট ছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজ সচেতন, কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন। বেগম রোকেয়ার জীবনে স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেনের ভূমিকা ছিল সুদুরপ্রসারী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদার ও মুক্ত মনের অধিকারী স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় রোকেয়া দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হয় এবং ক্রমশ ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপ্রেরণায়।
কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার সেটেলমেন্ট বিভাগে কানুনগো পদে তিন বছর কাজ করেছিলেন। যতীন্দ্রমোহন বাগচী (১৮৭৮-১৯৪৮) কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স ইন্সপেক্টর ছিলেন। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী উপন্যাস। এ উপন্যাসের লেখক মানিক বন্দোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) পিতা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতার অনুপ্রেরণাই ছিল মানিক বন্দোপাধ্যায়ের সাহিত্য সৃষ্টির উৎস। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের (১৯২৯-১৯৯৪) পিতা সৈয়দ আব্দুল আলী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তিনিও পিতার নিকট থেকে সাহিত্য সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পান। নাট্যকার নুরুল মোমেন (১৯০৬-১৯৮৯) সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন।
কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন (১৭২০-১৭৮১) প্রথম বাঙালি যিনি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন। বাংলা কবিতায় তিনিই প্রথম ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন। কবিতাটির যে অংশে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হল: - - - আমি কি আটাশে ছেলে/ এবার করব নালিশ নাথের আগে ‘ডিক্রি’ লব এক সওয়ালে। এটিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম কবিতা যার মধ্যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যিনি এ কাজটি করেছেন তাঁর নাম কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন এবং তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতের শেষদিকে কলকাতা হাইকোর্টের ইংরেজ এটর্নি উইলিয়ম হিকির এটর্নির কারণিক।
প্রথম যে বাঙালি ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থ প্রকাশ করেন তিনি ছিলেন ফোর্ড উইলিয়ম কলেজের একজন কর্মচারী। তাঁর নাম মোহনপ্রসাদ ঠাকুর। মোহনপ্রসাদের প্রথম বই এ ভোকাবুলারি, বেঙ্গলি এন্ড ইংলিশ ফর দি ইউজ অব স্টুডেন্টস’ ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। সুতরাং ইংরেজি ভাষায় প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের কৃতিত্বও একজন প্রশাসকের।কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-১৮৭০) অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্যা পিস ছিলেন। আইসিএস আর এন ব্যানার্জীর কন্যা কবিতা সরকার (১৯২৪-১৯৮৩)। এন ব্যানার্জী কন্যাকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জন্মলগ্ন থেকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি কন্যাকে প্রশাসকের স্নেহছত্রে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
এক সময় অনেক পেশাদার লেখক ছিলেন, যাঁরা শুধু সাহিত্য কর্ম করতেন। এখন পেশাদার লেখক বলতে সাংবাদিকগণকে বুঝানো হয়। শিক্ষক ও সাংবাদিকগণের পেশার সঙ্গে লেখালেখি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিশেষ করে সাংবাদিকগণের পেশা হতে লেখালেখিকে বিচ্ছিন্ন করার কোনও উপায় নেই। তবে অন্য যে সব পেশার লোক সাহিত্য কর্ম করেন তাঁরা সংখ্যায় যতই ক্ষুদ্র কিংবা তাঁদের সাহিত্য কর্ম যতই নগণ্য হোক না, কর্মপ্রকৃতি ও পরিবেশগত কারণে তাঁদের সাহিত্যকর্ম বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে। সেনাবাহিনীর কাজ যেমন য্দ্ধু করা তেমনি শিক্ষক আর সাংবাদিকগণের কাজ লেখালেখি করা। তবু যাঁরা কেবল সৃষ্টি ও আনন্দের জন্য এ কাজটি করে থাকেন তাঁরা বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখেন। শিক্ষকগণকে লেখালেখির জন্য পদোন্নতির অতিরিক্ত সুযোগ প্রদানের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অন্য কোনও পেশায় সে ব্যবস্থা নেই। তবু তাঁরা লিখেন- কোনোরূপ পার্থিব প্রাপ্তির প্রত্যাশা ব্যতিরেকে Ñ মূলত এখানেই তাদের কৃতিত্ব।
একজন শিক্ষিত ব্যক্তি যা শিখেছেন, দেখেছেন, জেনেছেন তা যদি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে না-যান কিংবা না-পারেন তাহলে তাঁর সার্থকতা কোথায়। মানুষ আর পশুর মধ্যে অনেকগুলো তফাতের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তথ্যের প্রজন্মন্তর। উত্তরপূরুষকে তথ্য ও জ্ঞানের সঞ্জীবনী সুধায় উন্নত করার জন্য কেবল মানুষই জ্ঞাতসহকারে পরিকল্পিত কর্ম সম্পাদন করে থাকেন। লেখা, চিত্র, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে এটি করা হয়। যারা এ কর্মটি সুচারুরূপে সম্পাদন করতে পারেন তাঁরাই সুচারু মানুষ। সুতরাং যাঁরা মানুষ আর পশুর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপন করে মানুষকে সৃষ্টির সেরা প্রতিপন্ন করার কাজে শ্রম দিয়েছেন তাঁরাই আদর্শ মানুষ।
উপমহাদেশের প্রশাসকগণ সাহিত্যকর্মের মতো ইতিহাস-রচনাতেও গুরুত্বর্পূ অবদান রেখেছেন। সিভিল সার্ভেন্টগণ ইতিহাস চর্চা না-করলে উপমহাদেশের ইতিহাস চর্চা এত সমৃদ্ধ হতো না। প্রাচীনযুগ হতে প্রশাসকগণ ইতিহাস রচনায় যুক্ত হয়ে আমাদের অতীতকে বর্তমানের ক্যানভাসে জীবন্ত করে রেখেছেন। তবকাত- ই- আকবরি, তবকাত-ই-নাসিরী, তাজকিরাত-উল-ওয়াকিয়াত, তারিখ- ই- খান জাহানী ওয়া মাখজান-ই-আফগানী, তারিখ-ই-দাউদী, তারিখ-ই-নুসরত জঙ্গী, তারিখ-ই-ফিরিশতা, তারিখ-ই-ফিরুজাশাহী (আফিফ), তারিখ-ই-ফিরুজশাহী (বরনী), তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহব্বত জঙ্গী, তারিখ-ই-মুবারকশাহী, তারিখ-ই-রশিদী, তারিখ-ই-শাহ সুজাই, তারিখ-ই-শাহী, তারিখ-ই-শেরশাহী, তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী, তুজুক-ই-বাবুরী, বাহারিস্তান-ই-গায়েবি, মুন্তখব-উত-তওয়ারিখ, মাশির-উল-উমারা, রিয়াজ-উস- সালাতীন, সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীন, আকবরনামা, আইন-ই-আকবরি প্রভৃতি গ্রন্থ প্রশাসকদের লেখা।
বাংলাভাষী আইসিএস অফিসারগণের অধিকাংশই নিয়মিত লিখতেন। সিএসপি অফিসারগণের মধ্যেও এ প্রবণতা ছিল। হাসনাত আবদুল হাই, মনজুরে মাওলা, মোফজ্জল করিম, আবদুশ শাকুর ছাড়া আরও অনেকের কথা উল্লেখ করা যায়। ব্রটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমলে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে যারা মেধা তালিকায় প্রথম হতেন তাঁরাই কেবল আইসিএস এবং সিএসপি বিশেষ করে প্রশান ক্যাডারের সদস্য হবার যোগ্যতা রাখতেন কারণ তাঁরাই অত্যন্ত আগ্রহভরে প্রশাসক হবার জন্য লড়তেন। যারা কৃতকার্য হতেন না তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণার কাজে জড়িত হতেন। সেকালে প্রশাসন ক্যাডারই ছিল মূল আকর্ষণ তাই ঐ ক্যাডারে মেধাবীরা ভীড় জমতো। ফলে প্রশাসন ক্যাডার ছিল জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মেধাবীদের মিলন মেলা। এখন প্রশাসন ক্যাডারের সে ঐতিহ্য নেই। কেন নেই? ঐতিহ্য নেই বলে কী মেধা নেই. না কি মেধা নেই বলে ঐতিহ্য নেই? এ প্রশ্ন এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। এখন প্রশাসন ক্যাডার মধ্যম মানের সদস্যে ভর্তি। গুটি কয়েক প্রতিভাবান ‘অড ম্যান আউট’-এর মতো অবস্থায় নিহিত। সাহিত্যকর্মে সরকারি চাকরিজীবীগণের একচ্ছত্র প্রভাব আর নেই। সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত থাকার চেয়ে, তাঁরা এখন পদোন্নতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাই প্রতিভা থাকলেও চর্চচার অভাবে তা মরিচা-জর্জরিত লোহার মতো নষ্ট হয়ে যায়। এর কারণ যাই হোক না কেন, আবার যেন তাঁরা তাদের উত্তরসুরীর ন্যায় সাহিত্য জগতে মনোনিবেশ করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় নিজেদের জ্ঞান, মেধা ও সৃজনশীলতাকে নিয়োজিত রাখেন - এ প্রত্যাশাই করি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন