রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৬

ড. মোহাম্মদ আমীন, বঙ্কিমচন্দ্র ও সাহিত্য চর্চা / মো: আব্দুস সালাম খান

মোহাম্মদ আমীনের চকরিয়ার ইতিহাস  অভয়নগরের ইতিহাস গ্রন্থে যে সকল চমৎকার তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা পড়ে মুগ্ধ হতে হয়। পুঁটি মাছের মুখ দিয়ে “ পৃথিবীতে একমাত্র  মানুষই নিজের মলমূত্র খায়  “ বলিয়ে যেভাবে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করা হয়েছে তাতে স্যানিটেশন সম্পর্কে  মানুষ  সচেতন না হয়ে পারে না।  তার গ্রন্থসমূহে অতীতকে জানার এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনার জন্য মানব সমাজকে সাহায্য করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সাহিত্য চর্চায় তার মেধা ও শ্রম কাজে লাগিয়ে মানব কল্যাণে তিনি আরও ব্রতী হবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তার সাধানা তাকে খ্যাতির উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করবে এটাই কামনা করি।
জনাব আমীনের লেখা  ‘বনমামলা দায়ের ও পরিচালনার কৌশল’ এবং ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ও আদেশনামা’ বইদুটো আমাদের সহকর্মীদের দৈনন্দিন কর্তব্যপালনে উপকারে আসবে। বই দুটো প্রশাসনে নিয়োজিত উদীয়মান কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রমে আরও সুদক্ষ করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। জনাব মোহাম্মদ আমীন আমাদের গর্ব। আমি তার চমৎকার লেখার প্রশংসা করছি। তার এ কর্ম প্রচেষ্টা অন্যদেরকে বই লিখতে অনুপ্রাণিত করবে।
কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনাব আমীনের সাহিত্য চর্চায় আমি মুগ্ধ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ম্যাজিস্ট্রেসির পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা করে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ যিনি লিখেত পারেন তার পক্ষে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করা অসম্ভব নয়। তার জন্য আমি গর্ববোধ করি।

লেখক : মো: আব্দুস সালাম খান, প্রাক্তন সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও  রেক্টর, বিপিএটিসি, সাভার, ঢাকা এবং প্রাক্তন জেলাপ্রশাসক, চট্টগ্রাম।

ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ (আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের জবানিতে) স্বাধীনতা যুদ্ধের জীবন্ত দলিল / সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

‘ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ’ বইটা একনাগাড়ে পড়ে  শেষ করলাম। আসলে শেষ না করে উঠতে পারছিলাম না। ভালো লেগেছে তা বলাই বাহুল্য। এত ভালো লেগেছে যে, পড়তে  বইটা আমার চেতনায় স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধ সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। পড়তে
ড. মোহাম্মদ আমীন
পড়তে প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। তাই পাঠ শেষ করে কিছু আলোচনা লিখতে বসে যেতে বাধ্য হই। বইয়ের নায়ক সুবেদার মেজর আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের লড়াই নিশ্চিতভাবে এক গৌরবজনক অধ্যায়। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর এবং তাঁর মতো আরও অনেকের একাগ্র ও অকুতোভয় ভূমিকা আমাদের দিয়েছে মহান স্বাধীনতা। বিশেষ করে আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের সাহস, যুদ্ধকৌশল, দেশপ্রেম, পরিবার-পরিজনের প্রতি অগাধ দরদ, দেশের শত্রুর প্রতি বজ্রকঠোর অবস্থান ও মানবতাবোধ সত্যি মুগ্ধকর।
বইয়ে তেতুলিয়া নামের একটি জায়গার উল্লেখ পেলাম। আমারও যুদ্ধ করি তেতুলিয়া
অঞ্চল জুড়ে। তবে এ তেতুলিয়া আলাদা, এটা নাভারণ ও সাতক্ষীরার মধ্যবর্তী অঞ্চল। এখানকার লড়াইয়ের পরিবেশটিও ছিল আলাদা। এখানকার ইপিআর যারা ছিলেন, তারা কখনও বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে কোনো হামলায় (রেইডে) অংশ নিতেন না। তারা আমাদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) পাঠাতেন। মোট পাঁচটি অভিযানে আমি ও আমার নিকট বন্ধুরা সক্রিয় অংশ নিয়েছিলাম। যার চারটিতে নিশ্চিতভাবে সফল হই।বাকিটায় আমাদের সাংঘাতিকভাবে ক্ষতি হয়। কজন মারা যান, তাও কোনোদিন জানতে পারিনি। সম্ভবত কয়েকজন পালিয়ে চলে যান- যারা ক্যাম্পে রিপোর্ট করেননি। কয়েকজন মারাও যান। একমাত্র আমি পালিয়ে এসে ক্যাম্পে রিপোর্ট করি। ঘটনার পর আমাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ‘আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের জবানিতে ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ’ বইটি পড়ে শেষ করার পর মনে হলো- একটা যুদ্ধের সিনেমা দেখা শেষ হয়েছে। সিনেমা নয়, যেন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধে অংশ না নিয়েও আপিন চমৎকারভাবে যুদ্ধের ছবি এঁকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের এমন চমৎকার ও প্রত্যক্ষদর্শীর মতো নির্ঝর বর্ণনাসম্বলিত আর কোনো বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
যুদ্ধ সবসময় উভয়পক্ষ জয়ের জন্য করে। আমরা বাঙালি, তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা
আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক পদক নিচ্ছেন
ছিল আমাদের জীবনের চেয়েও বড়। এজন্য আমরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে সর্বদা প্রস্তুত ছিলাম। তবে মেজর, তার স্ত্রী ও শিশুপুত্রের হত্যার ঘটনা মনকে সাংঘাতিকভাবে আড়ষ্ট করে দিয়েছে, মেনে নিতে পারছি না। এটি আবারও প্রমাণ করেছে, যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া সবার জন্য সবসময় ক্ষতিকর। এ একটি ঘটনা, বইয়ে আলোচিত সব আনন্দঘন ঘটনাকে ছাপিয়ে মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। যদিও আমি তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। তারাই আমাদের সহযোদ্ধাদের হত্যা করেছে। অন্যায় যুদ্ধ আমরা যেন আর না করি। দুপক্ষই যুদ্ধের ব্যাকরণ ভাঙলে হানাদার আর মুক্তিযোদ্ধার পার্থক্য থাকে না। আপনার বইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে একটি জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।
লেখক সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস একজন মুক্তিযোদ্ধা, দলিত আন্দোলনের নেতা।বাংলাদেশের যশোর জেলার মশিয়াহাটি গ্রামে বিশ বছর পর্যন্ত ছিলেন।  এখান বাস করেন ভারত। তার বর্তমান ঠিকানা: নতুন পল্লী, ডাকঘর : মছলন্দপুর, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ। 

হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত / শাহজাদা শামস ইবনে শফিক

হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখকের আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। হাতিয়ার ইতিহাস লিখে, লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল অ্যাসোশিয়েশন এর  সম্মাননা। আমরা জানি, হাতিয়া বাংলাদেশের একটি দ্বীপ-উপজেলা। একসময় এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নানা শাসকের উত্থান-পতন, পর্যটকদের আগমন-বহির্গমন প্রভৃতি বিষয়ের মূলভূমি ছিল হাতিয়া বা প্রাক্তর সাগরদ্বীপ বা
সাগরদি। এ হাতিয়ার ইতিহাস লিখেছেন ড. মোহাম্মদ আমীন। হাতিয়া অতি প্রাচীন জনপদ, ড. আমীনের মতে প্রায় ৬ হাজার বছর। এমন একটি প্রাচীন জনপদের ইতিহাস এতদিন কেউ রচনা করেননি, এটি ছিল সত্যি দুঃখজনক। কেন জনাব আমীন হাতিয়ার ইতিহাস রচনা উদ্যোগী হলেন সেটি ‘তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থ’ এর ভূমিকা পড়ে কিছুটা জানা যায়। তিনি লিখেছেন : - -  ১৯৯৭ খ্রিস্টব্দে দ্বীপায়ণ, ১২-তম সংখ্যার সম্পাদক, হাতিয়া জনকল্যাণ সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক ও তরুণ লেখক জনাব মো: নাজিম উদ্দিন তাঁর লেখা প্রবন্ধ ‘হাতিয়ার ভাষা ও মুসলিম আদি বসতি’ প্রবন্ধের উপসংহারে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় হাতিয়ার ইতিহাস রচনার জন্য অনাগত কাউকে উদাত্ত আহবান জানানোর পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এ আহবানের আন্তরিকতা ও আবেগময় ক্লেশ আমার মনে দাগ কাটে। হাতিয়াবাসী না হই, বাংলাদেশি তো বটে। লেখালেখি আমার সখ জানতে পেরে হাতিয়া উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চেয়ারম্যানবৃন্দ ২০০০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে আমার অফিসে এসে হাতিয়ার উপর একটি গ্রন্থ লেখার অনুরোধ করে। নাজিমের আহবান এবং চেয়ারম্যান বৃন্দের অনুরোধের স্বতঃস্ফুর্ত আন্তরিকতায় উদ্বেল হয়ে উঠে আমার সখ এবং অবসর কাটানোর মৌনতা। এমন সুযোগ ছাড়ে কে?

 ড. মোহাম্মদ আমীন উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন ‘তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ শিরোনাম দিয়ে হাতিয়ার ইতিহাস লিখেন। আঞ্চলিক ইতিহাসের অগ্রায়নে এটি ছিল একটি অমূল্য সংযোজন। অপূর্ব সুন্দর হাতিয়ার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে জনাব আমীন হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন : ~চাকুরী সুবাদে হাতিয়া, নইলে হাতিয়ার মতো এত সুস্মিত দ্বীপ-খন্ডটি ও তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অন্তরালিত   ইতিহাসের স্মারকটি  আমার চেনাই হতো না কোনদিন, ঠিক যেমন চেনা বা দেখা সম্ভব হচ্ছে  না দেশের আরও অনেক নয়নাভিরাম প্রত্যন্ত এলাকা। হাতিয়া এসেই আমি অবাক, এ শুধু ভূখন্ড নয়, ভূ-স্বর্গ, বিস্ময়ের অপার মৌনতায় পরিপূর্ণ অবকাশের মনলোভা সোহাগ, মাখনের মত সোঁদা সোঁদা গন্ধে তুলতুলে অতুল। মুহূর্তের ক্ষণগুলো যুগ যুগ জিইয়ে রাখা জলের মাঝে ভাসমান একটি প্রমোদতরী যেন। স্বপ্ন বিলাসের অত্যুত্তম নিদাঘ হয়ে ডাকছে, “এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে --। আমি এলাম”। ড. মোহাম্মদ আমীন একজন অসাধারণ ইতিহাস রচয়িতা। আঞ্চলিক ইতিহাসে তিনি যেমন নিগুঢ় তেমনি বিচক্ষণ। নামকরণের মাধ্যমে কীভাবে প্রকৃত ইতিহাসকে টেনে তুলে আনা যায় আবার কীভাবে ইতিহাসের মাধ্যমে নামকরণ বৃত্তান্তকে স্পষ্ঠীকরণ করা যায়- তা, তাঁর ইতিহাসবিষয়ক বইগুলো না-পড়লে বোঝা যাবে না। এ ইতিহাস গ্রন্থটি রচনার জন্য তিনি
পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার। আঞ্চলিক ইতিহাসে অসামান্য অবদানের জন্য ইউরোপের মেসেডোনিয়া হতে তাকে দেওয়া হয়েছে সম্মান। তিনি হাতিয়ার ইতিহাস রচনার জন্য “ হেরিডোটাসা ফাদার অব দ্যা হিস্ট্রি অ্যাওয়ার্ড/২০১৫” অর্জন করেছেন। তাঁর অন্যান্য আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থের মধ্যে ‘বাংলাদেশের জেলা উপজেলা ও নদনদীর নামকরণের ইতিহাস, চকরিয়ার ইতিহাস, ভেদরগঞ্জের ইতিহাস, অভয়নগরের ইতিহাস, অভয়নগর প্রোফাইল, কক্সবাজারের ইতিহাস, চন্দনাইশের ইতিহাস  প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।  বিশেষ করে হাতিয়ার ইতিহাস লিখে তিনি দ্রুতভাঙ্গনশীল হাতিয়াকে প্রকৃত অর্থে চিরদিনের জন্য স্থায়ী করে রেখে গিয়েছেন। তিনি ওই ইতিহাস না-লিখলে হয়তো এখনও হাতিয়ার ইতিহাস লেখা হতো কিনা সন্দেহ। এভাবে হয়তো হাতিয়া হারিয়ে যেত অনেক জনপদের ন্যায় জলের তলে। হাতিয়ার উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন ড. মোহাম্মদ আমীন গ্রন্থটি রচনা করেন। এটি হাতিয়ার উপর লেখা প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ এবং একমাত্র ইতিহাস।

ইতিহাস বলা হলেও এ গ্রন্থে রয়েছে নৃতত্ত্ব, জনমিতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রশাসন, ভূপ্রকৃতি, নামকরণসহ আরও নানা বিবরণ। প্রতিটি বিবরণ তথ্যসমৃদ্ধ এবং সর্বজনীন হিসাবে ইতোমধে স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এমন একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করায় ড. আমীন সম্মানজনক এ পুরস্কার লাভ করেন। ড. আমীনের হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব ও রেক্টর, বিপিএটিসি বলেন,  “তিলোত্তমা হাতিয়া’ যিনি লিখেত পারেন তার পক্ষে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করা অসম্ভব নয়। তার জন্য আমি গর্ববোধ করি।”  
বইটির প্রকাশক হাতিয়া জনকল্যাণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষনা ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম। এমন একটি বই প্রকাশ করায় হাতিয়া জনকল্যাণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম নিশ্চয় গ্রন্থের মতো কালজয়ী হয়ে থাকবে।

আলোচ্য ব্লগের লেখক : শাহজাদা শামস ইবনে শফিক, সম্পাদক, সাপ্তাহিক দিগন্ত ধারা ।

শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬

ড. আবদুল করিমের চোখে ড. আমীনের চকরিয়ার ইতিহাস / আনোয়ার হোসেন কন্ট্রকটার


চকরিয়ার বিজ্ঞ উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মোহাম্মদ আমীন চকরিয়া নিয়ে কাজ করছেন শুনে আমি বেশ খুশি হই। অফিস সময়ের পর তিনি বেরিয়ে পড়েন ইতিহাসের সন্ধানে। এটি যদি হয় তো, তা হবে আমাদের জন্য এক বিরাট পাওয়া। তবে অনেকে সমালোচনাও শুরু করেছেন। ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে বই লেখেন। কয়েকজন শিক্ষক, সাংবাদিক ও পেশাজীবী 
ড. আবদুল করিম (১৯২৮-২০০৭)
আমাকে জনাব আমীন সম্পর্কে কিছু আকর্ষণীয় তথ্য দিলেন। ছাত্র জীবন হতে তিনি লেখালেখি করে আসছেন। চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলায় বাড়ি, বেশ ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান। আমি রাজনীতি করি, তখন চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সাহস করে একদিন উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে গেলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, চকরিয়ার ইতিহাস রচনায় যে কোনোভাবে হোক কিছু অবদান রাখা। চকরিয়ার ইতিহাস রচনায় আমার আগ্রহ শুনে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন তিনি।আমার হাতে একটা পাণ্ডুলিপি দিয়ে দেখতে বললেন। পাণ্ডুলিপি দেখে আমি অবাক। ইতিহাস তো হয়েই গেছে।এখন কেবল ছাপা। কীভাবে এটি সম্ভব হলো? মনের প্রশ্ন মনে রেখে দিই। তাঁর সম্পর্কে যা শুনেছি, তার অর্ধেক সত্য হলেও এটি তেমন কঠিন নয় জনাব আমীনের কাছে।
বিনয়ের সঙ্গে বললাম, যদি অনুমতি দেন তো, আমি বইটি প্রকাশ করব।আমার কথায় তিনি রাজি হলেন।
প্রকাশ করে ফেললাম ‘চকরিয়ার ইতিহাস’। প্রকাশ হওয়ার চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। আলোচনা, সমালোচনা, প্রশংসা- সব। আমি ইতিহাস বুঝি না। বইটি কেমন হয়েছে জানার জন্য একদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এশিয়া মহাদেশের বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আবদুল করিম সাহেবের কাছে নিয়ে যাই। ড. করিম আবার আমার আত্মীয়। তিনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর  থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরউপাচার্য পদে নিযুক্ত ছিলেন।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আবদুল করিমের (জন্ম ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১ জুন গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলা বাঁশখালী উপজেলা চাপাছড়িতে ভিন্ন উপজেলা হলেও, ভৌগলিক দিক হতে উভয় উপজেলার অনেক মিল ছিল। একসময় নাকি দুটো উপজেলা অভিন্ন ছিল।যাই হোক, ড. করিম, জনাব মোহাম্মদ আমীনের লেখা ‘চকরিয়ার ইতিহাস’ বইটি পড়তে শুরু করেন। আস্তে আস্তে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি বইয়ে একাগ্র হয়ে পড়েন। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর বই হতে মুখ তুলে বলেন : মোহাম্মদ আমীন কে? 
আমাদের উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট।প্রশাসন ক্যাডারের লোকের পক্ষে কীভাবে এমন তথ্যবহুল ইতিহাস লেখা সম্ভব হলো? এরা তো এত জ্ঞানী ও দূরদর্শী নন। এমন ছেলে কেন অ্যাডমিন ক্যাডারে গেল?প্রশংসা শুনে আমি খুশিতে হাসছি। ড. করিম বলেই যাচ্ছিলেন : আনোয়ার, এ তো অবিশ্বাস্য, আমি তো এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস আর দেখিনি। অ্যাডমিন ক্যাডারেও তাহলে মেধাবীদের কেউ কেউ যায়!ড. করিমের এমন প্রশংসা আমাকে প্রকাশক হিসাবে গর্বে অভিভূত করে দেয়। আবার পড়তে শুরু করেন তিনি। আরও আধঘণ্টা পড়েন, তারপর মুখ তুলে বললেন : ছেলেটাকে ডেকে নিয়ে আসেন, আমি তার কাছ থেকে ইতিহাস লেখার এমন অদ্ভুদ কৌশলটা শিখব।তিনি যে কৌশলে ইতিহাস লিখেছেন, সেটি আয়ত্তে আনা কঠিন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লেকচার দিয়ে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। মাঠ 
পর্যায়ে মাঠে থেকে কাজ করতে করতে তা জানতে হয়। তিনি কী আরও কোনো ইতিহাস লিখেছেন?লিখেছেন। হাতিয়ার ইতিহাস।হাতিয়ার উপর আমি কাজ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু একটা তথ্যও সংগ্রহ করতে পারিনি। এ ছেলে তো বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। যত তাড়াতাড়ি পারেন তাকে নিয়ে আসেন।নিয়ে আসব।ইতোমধ্যে চা এসে যায়।চায়ে ভিজিয়ে বিস্কুট খেতে খেতে ড করিম বললেন: এটি কেবল নামেই ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে এটি শুধু ইতিহাস নয়, বৈচিত্র্যহাস; ভূগোল, জনমিতি, ধর্ম, বিবর্তন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্রমবর্ণনা, জনজীবনে সমুদ্রের প্রভাব, শরণার্থী, প্রস্তর যুগ হতে বঙ্গযুগ- সব বিবরণ এমন নির্ভুল তথ্যসহকারে তুলে ধরেছেন, যা আমার পক্ষে এত চমৎকারভাবে সম্ভব হতো না কখনও।ছেলেটিকে নিয়ে আসুন। আমি তার সঙ্গে একটু কথা বলব, আমার শেষ ইতিহাসের কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।কয়েকটি বিষয়ে আটকে গেছি।
ড. আমীনকে, আমি করিম সাহেবের প্রশংসার কথা বলেছিলাম।তিনি খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ড. করিম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। এত বড় একজন জ্ঞানী আমার প্রশংসা করেছেন, এর চেয়ে মর্যাদার আর কী হতে পারে? কিন্তু আজ-কাল করে যাওয়া হয়নি। শেষপর্যন্ত ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুলাই ড. আবদুল করিম চিরদিনের জন্য আমাদের সাক্ষাতের বাইরে চলে যান। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।                                    

এখন ‘চকরিয়ার ইতিহাস’ বইটির প্রবল চাহিদা। লন্ডন, কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, জাপানসহ পৃথিবীর অনেক দেশে চকরিয়ার অনেক লোক আছে। তারা আমাকে ফোন করেন, ফোন করে বইটি পাঠানোর অনুরোধ করেন। পাঠানোর মতো বই আমার আর নেই। ড. আমীনকে বলেছিলাম, আরও কিছু প্রকাশ করার জন্য। তিনি বলেছেন, নতুন তথ্য সংযোজন করতে হবে। তিনি নানা কাজে ব্যস্ত, আমিও আগের মতো সময় দিতে পারছি না। তবে শীঘ্রি পরিবর্ধিত সংস্করণ বের করার পরিকল্পনা আছে। আমি গর্ব বোধ করি। এমন সম্মানজনক ও স্থায়ী কাজ আমার পক্ষে আর কখনও করা সম্ভব হবে না। বইটির মাঝে আমি বেঁচে থাকব। বেঁচে থাকবে বইটির লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন। যতদিন চকরিয়ার থাকবে, ততদিন আমরা চকরিয়ার স্মৃতি আমাদের কাজে অক্ষয় হয়ে থাকবে। মরণশীল মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! চকরিয়া আজ পূর্ণ ইতিহাসে ঋদ্ধ, সারাবিশ্বে চকরিয়ার ইতিহাস আমাদের ঐতিহ্যকে আলোর মতো অফুরন্ত জ্ঞানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই আমি মনে আমার প্রকাশনায় প্রকাশিত ও ড. মোহাম্মদ আমীনের লিখিত চকরিয়ার ইতিহাস চকরিয়াবাসীর ‘ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদা’ অনিবার্য প্রতীক।

ড. মোহাম্মদ আমীন নিভৃত সাধক / ড. রচনা ব্যানার্জী

অনেক মানুষ কম কাজ করেও বেশি পরিচিতি পায় আবার অনেকে প্রচুর কাজ করেও পরিচিতি পায় না। আমি এখানে তেমন একজন লোকের কথা লিখছি। যার সঙ্গে কথা বললে মনে হবে, আপনি একজন শিশুর সঙ্গে কথা বলছেন। অথচ আমার দেখা কয়েকজন মেধাবী ব্যক্তির মধ্যে তিনি অন্যতম। মানুষ কীভাবে এত সহজ ও এত সরল হয়, তাঁকে না-দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর। অথচ তিনি এত মেধাবী যে, যে কোনো বিষয়ের উপর , বলা যায় কোনো সময়ক্ষেপণ ছাড়া, বিশাল গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখে দেওয়ার মতো অলৌকিক ক্ষমতা রাখেন। যদিও আমি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করি না। তার নাম ড.
মোহাম্মদ আমীন। পরিসংখ্যানের ছাত্র কিন্তু পিএইচডি করেছেন ওয়ার ক্রাইমে। প্রথমে ছিলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এমএস করেছেন সমাজ ও পরিবার বিজ্ঞানে, বিশেষ ডিগ্রি নিয়েছেন বাংলায়। পরিসংখ্যানের ছাত্র হলেও বাংলা বানান বিষয়ে তার মতো দক্ষ বাংলাভাষীর সংখ্যা হাতেগুণে বলে দেওয়া যায়। আমি বাংলার অধ্যাপক হলেও, তার কাছে অনেক শব্দের বানান ফোন করে জেনে নিই। জেনে নিই- কেন শব্দের বানান এমন! তিনি বলে দেন, জলের মতো পরিষ্কার করে। আর ভুলি না, ভুল হয় না। বিশেষ করে, ‘এমন কি’, ‘এমন কী’ এবং ‘এমনকি’ কথার বানান, ব্যবহার ও প্রয়োগ বলতে গেলে আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি। আগেও শিখলেও এত জটিল ছিল যে, মনে রাখতে পারতাম না।
ড. মোহাম্মদ আমীন একজন অসাধারণ ইতিহাস রচয়িতা। আঞ্চলিক ইতিহাসে তিনি যেমন নিগুঢ় তেমনি বিচক্ষণ। নামকরণের মাধ্যমে কীভাবে প্রকৃত ইতিহাসকে টেনে তুলে আনা যায় আবার কীভাবে ইতিহাসের মাধ্যমে নামকরণ বৃত্তান্তকে স্পষ্ঠীকরণ করা যায়- তা, তাঁর ইতিহাসবিষয়ক বইগুলো না-পড়লে বোঝা যাবে না। বিশেষ করে তার লেখা, ‘বাংলাদেশের জেলা উপজেলা ও নদনদীর নামকরণের  
ইতিহাস, তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, চকরিয়ার ইতিহাস ও অভয়নগরের ইতিহাস  প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। তার চকরিয়ার ইতিহাস পড়ে বিশ্বের বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আবদুল করিম আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন : ছেলেটিকে ডেকে নিয়ে আসেন, আমি তার কাছ থেকে ইতিহাস লেখা শিখব।’ চকরিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের প্রকাশক আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেনের কাছে আমি এ গল্পটি শোনার সুযোগ পেয়েছি। তিনি ‘চকরিয়ার ইতিহাস’ নিয়ে ড. আবদুল করিমের কাছে গেলে’ ড করিম এমন উচ্ছ্বসিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে তিনি এমন সব জায়গার ইতিহাস লিখেছেন, যেসব স্থানের ইতিহাস আগে কেউ লিখেননি বা লিখতে পারেননি।
ড. মোহাম্মদ আমীন একজন প্রাবন্ধিক, ইতিহাসবেত্তা, গবেষক, জীবনীকার, ঔপন্যাসিক, রম্যরচয়িতা, গাল্পিক, বাংলা ভাষা বিশারদ। এতগুণ থাকা সত্ত্বেও  তিনি অত্যন্ত প্রচারবিমুখ। শুধু বাংলাদেশ নয়, তাঁর নিজ উপজেলা চন্দনাইশেরও অনেক লোকও জানেন না, ড. মোহাম্মদ আমীন নামের একজন আন্তর্জাতিক মানের লেখক তাদের উপজেলায় রয়েছে।  এটি আমার কাছে অবাক মনে হয় না, কারণ প্রাচীনকাল হতে জেনে আসছি, গায়ের যোগী ভিখ পায় না। তিনি গায়ের সমাদর না-পান, আন্তর্জাতিক মহল তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। পেয়েছেন আমেরিকা, ভারত, ইউরোপ প্রভৃতি দেশ হতে স্বীকৃতি। অধিকন্তু জীবিত অবস্থায় কাউকে সম্মানিত করতে বাঙালি বড় কুণ্ঠিত। ড. আমীনের পিতামহের ছোট ভাই আহমদ হোসেন একজন বীরপ্রতীক। তাঁকেও চন্দনাইশের অনেকে চেনেন না।
দেশের মানুষ না-চিনলেও চন্দনাইশ উপজেলার এ প্রচারবিমুখ ব্যক্তির প্রতিভাকে খুঁজে নিয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল হিস্ট্রি এসোসিয়েন’।  বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অধিবাসী ড. মোহাম্মদ আমীনকে  সুদূর ইউরোপের মেসেডোনিয়া থেকে ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল হিস্ট্রি এসোসিয়েশন’প্রদত্ত সম্মানজনক “ হেরিডোটাস, ফাদার অব দ্যা হিস্ট্রিঅ্যাওয়ার্ড, ২০১৫” প্রদান করা হয়েছে। এটি অনেক বড় বিষয়। অথচ একথাটাও তিনি কাউকে বলেননি।  ইন্টারনেট এবং তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল হিস্ট্রি এসোসিয়েন’ড. মোহাম্মদ আমীন ও তাঁর কৃতিত্বের খোঁজ পান বলে সংগঠনের কাছ থেকে জানা যায়। 
এটি একটি অত্যন্ত সম্মানজনক পুরস্কার। ড আমীনের নিকট পুরস্কার কোনো বিষয় না। তিনি কোনো পুরস্কারের আশা করেন না।  প্রতিবছর সারা বিশ্বে ১০৩ জনকে এ পদক প্রদান করা হয়। আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় অবদানের জন্য ড. মোহাম্মদ আমীনকে এ পুরুস্কারে ভূষিত করা হয়। বর্তমানে তিনি Impact of Biodiversity on human activities' শিরোনামের একটি গবেষণা করছেন। এজন্য তিনি ব্রাজিল, পেরু, চিলি, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর এবং সংলগ্ন আমাজন জঙ্গল নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেন।
ড. মোহাম্মদ আমীন এ পর্যন্ত অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু কাউকে বলেননি। তার পুরস্কারসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাজা রাম মোহন রায় পর্ষদ প্রদত্ত বঙ্গভূষণ পদক, নিউইয়র্ক থেকে পাওয়া ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ অ্যাওয়ার্ড, হেরিডোটাস, ফাদার অব দ্যা হিস্ট্রিঅ্যাওয়ার্ড, কবি নজরুল পদক, মহাত্মাগান্ধী পুরস্কারসহ  আরও অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন।
ড. মোহাম্মদ আমীন চন্দনাইশ উপজেলার চন্দনাইশ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নুরুল ইসলাম, মায়ের নাম সকিনা বেগম এবং পিতামহ ছিলেন প্রখ্যাত পির মৌলানা গোলাম শরীফ| স্ত্রীর নাম চয়নিকা জাহান চৌধুরী। প্রথম সন্তানের নাম এসএম আবীর চৌধুরী এবং দ্বিতীয় সন্তানের নাম অনুসিন্থিয়া জাহান চৌধুরী। আমেরিকা থেকে পিএইচ ডি অর্জনকারী প্রচার-বিমুখ এ লেখকের গ্রন্থসংখ্যা ইতোমধ্যে ৭৪ অতিক্রম করেছে। তন্মধ্যে আমার জানা কয়েকটির নাম নিচে দেওয়া হলো।

১. জর্জ ওয়াশিংটন হতে বারাক ওবামা; 
২. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাতির পিতা; 
৩. ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ ; 
৪. হাসতে হাসতে বাংলা শেখা ; 
৫. বাংলা সাহিত্য ও ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ; 
৬. বাংলা বানান ও শব্দ চয়ন, 
৭. সহজ বাংলা উচ্চারণ;
৮. বাংলা সাহিত্যের অ আ ক খ; 
৯. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা; 
১০. আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী; 
১১. নন্দিত কান্না নিন্দিত হাসি ; 
১২. দুই রাজকুমারী ; 
১৩. রমণীয় পাঁচালী; 
১৪. খরগোশ ও কচ্ছপ; 
১৫. বদল বাড়ির ভূত; 
১৬. মানুষই সেরা; 
১৭. ছোটদের আন্তর্জাতিক দিবস ; 
১৮. অভয়নগরের ইতিহাস ; 
১৯. তিলোত্তমা হাতিয়া: ইতিহাস ও ঐতিহ্য; 
২০. চকরিয়ার ইতিহাস;
২১. ম্যাজিস্ট্রেসি ও আদেশনামা;
২২. বন মামলা দায়ের ও পরিচালনার কৌশল;
২৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আইন;
২৪. জল দুনিয়ার মানুষ;
২৫. বাংলা বানানে ভুল : কারণ ও প্রতিকার
২৬. সময়ের পরশ পাথর;
২৭. মোহনীয় নরক;
২৮. জেলা, উপজেলা ও নদ-নদীর নামকরণের ইতিহাস; 
২৯. বাংলা সাহিত্যে প্রশাসকদের ভূমিকা; 
৩০. রঙ্গরসে বাংলা বানান
৩১. বিড়ম্বনা
৩২. সায়েন্স ফিকশন কিউপ্রিট
৩৩. অফিস আদালতে বাংলা লেখার নিয়ম
৩৪. নিমক হারাম
৩৫. বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন
৩৬. মানুষ ও বিড়াল
৩৭. বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস
৩৮. বাংলা সাহিত্যে পুলিশের ভূমিকা
৩৯. ভূতঅঙ্কের জিরো থিয়োরি
৪০. দাপ্তরিক প্রমিত বাংলা বানা্ন নির্দেশিকা
৪১. ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স
৪২. মানুষ ও বিড়াল
৪৩. এ সমাজ
৪৪. Marriage, Love and woman.
৪৫. Role of Extra Judiciary organs to ensure effective Judiciary system.
৪৬. স্বপ্ন জড়ানো পাহাড়
৪৭. বাংলা সাহিত্যে প্রশাসক ইত্যাদি
৪৮. নন্দলালের তীর্থযাত্রা
৪৯. সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ১৯০-২০১২
৫০. বেত ভূতের ইন্তেকাল
৫১. বৈচিত্র্যময় তথ্যে সচিত্র নোবেল প্রাইজ
৫১. আন্তর্জাতিক দিবস (সচিত্র ও রঙিন)
৫২. রাজকীয় জীবন ও শারমেয় মরণ
৫৩. উল্টোদেশে নন্দ ঘোষ
৫৪. জামিন তত্ব ও রায়
৫৫. শুদ্ধ বানান চর্চা
৫৬. গদাই বাবুর তীর্থযাত্রা
৫৭. প্রশাসনের ভাইরাস
৫৮. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
৫৯. বঙ্গবন্ধুর বাণী
৬০. মামাল ও আইনি হয়রানি হতে নিষ্কৃতির উপায়
৬১. অলৌকিক মহিমা
৬২. মূল্যবোধ

ICT Sector of Bangladesh : Way of Improve / Dr. Mohammed Amin



1.      As nations attempt to build a sustainable ICT sector, commitment to the private sector and rule of law must be emphasized, so that Bangladesh can attract the necessary private investments to create the infrastructure.

2.      A second important pillar of the Bangladesh will be the need for content creation and intellectual property rights protection in order to inspire ongoing content development.

3.      Ensuring security on the internet, in electronic communications and in electronic commerce is also very important.  All of this works and is exciting for people as long as people feel that the networks are secure from cyber attacks, secure in terms of their privacy.

4.      ICT activities have to be spread throughout the Bangladesh according to the demand-base contents of the relevant inhabitants or stakeholders.

5.      Establish effective E-agriculture Management to develop eco-social life of the farmers of Bangladesh as well as the nations.

6.      Innovative broadband models being developed jointly by multi-stakeholders across the world will go some way towards providing ICT access to villages, schools and health centers in remote areas, connecting the unconnected in underserved communities. To do this successfully and sustainably strong international ICT relations have to be set up through Knowledge base Society.

7.      ICT’s Rule in Sustainable Development, Green Growth and e-Environment are indispensible to spread sturdy ICT field. So, It is very essential to set up sustainable development and green growth strategies to make world-class Bangladesh and ascertain Digital Bangladesh.

8.      Cyber security is a borderless issue that requires a global approach and concerted effort. We need to establish it as soon as possible as an enabling platform for international cooperation on ICT for development and for strengthening cyber-security worldwide.

9.      Who controls the net? USA or the neutral International Organization? It is now a crucial question.  World needs a neutral but powerful International authority to control internet with adequate representatives from the developing countries according the ICT users to set up Democracy in cyberspace. Bangladesh can initiate about the important matter.

10. To take projects on Women's empowerment in the information Society for systematic and scalable strategies.

11. To expand access to information on weather, climate and water.

12. To launch sustainable ICT infrastructure, cyber-security, enabling environment, e-learning, e-health, e-agriculture, media, accessibility, and ethics.

13. High level International dialogues or seminars, workshops, technical exchange, study tour on ICT among government representatives , business and civil society have to be introduce in liberal approach.

14. Now, the importance of broadband to national economic and social development cannot be neglected. We are all very much aware of how close we are to the 2015 deadline for meeting the WSIS targets and the Millennium Development Goals. We have made quite extraordinary progress in terms of connectivity, the creation of an enabling environment, and cyber-security. The next major step must be to repeat the mobile miracle for broadband Internet.

15. Annual losses of the world are more than 100 billion USD due to cyber-crime.  In the security business, trust is key, and if we do not start to develop such a culture of trust, there will be no way that the cyber world can ever become truly safe and secure. Global initiatives within the framework of ITU's Global Cyber-security Agenda (GCA), such as Child Online Protection (COP) and the International Multilateral Partnership Against Cyber Threats (IMPACT) can help Bangladesh to protect Cybercrime to ensure Cyber-security. So it is very important to launch extensive relation with the world ICT society.

16. Average Mobile Phone Density in Bangladesh is pleasing, but use coverage of mobile is very little. Most of the mobile users till unknown about the technical capacity range of his hand set. So, we need to create ICT base society to instruct mass people about the technical range and use method of their mobile set. It will encourage people to forward and penetrate the total ICT world. Then mobile Miracle rapidly and effectively will transfer spontaneously to the end edge of the remotest village of Bangladesh. It will be helpful to create ICT Knowledge Society.

17. Internet penetration is really such a high priority for people who, on a daily basis, face a lack of safe drinking water, rising food prices, and a chronic shortage of health care. Because the Internet, and especially broadband, is an extraordinary enabler which has potential to massively expand the effective delivery of vital services, such as health care and education. Nowhere is this more important than in countries where people are chronically deprived of these services. In order to help countries better exploit ICT to drive development, Bangladesh may take following actions:
(1)  A comprehensive capacity building and digital inclusion program have to be taken very extensively.
(2)  (2)Strategies to help rural people maximize the selection and use of appropriate new technologies, such as broadband, digital broadcasting and next-generation networks.
(3)  Assistance in dealing with cyber-security issues and strategies to build trust and confidence in ICT networks.
(4)  Assistance in creating and maintaining a propitious environment for rural development through an enabling policy and regulatory environment.
(5)  Connection fee and monthly bill might be reduced

18. Very important step must be to repeat the mobile miracle for broadband Internet. If 15, 16 and 17 steps are promoted, and then every mobile phone of Bangladesh has to turn into internet connections.

19. Both Telecommunication and ICT Ministry have to be placed in the same umbrella.




Comment
Road to Geneva is extremely easy but road to Bangladesh is dreadfully tough. So it is not enough to for us to do our best, we have to do what we need in the perspective of the globe by using all endeavors.

ব্যক্তি ও নাম / ড. মোহাম্মদ আমীন



ব্যক্তির পরিচয়টাই নাম। 
এ জন্য অনেক সময় জনপ্রিয়তাকে নামপ্রিয়তা হিসাবে ব্যবহার হতে দেখা যায়। 
লোকটি খুব জনপ্রিয়Ñ এ বাক্যটির অর্থ হতে পারে : লোকটি খুব সুনামের অধিকারী।
ব্যক্তি ছাড়াও ব্যক্তি-সমষ্টি, প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য যে কোনও কিছুর নাম থাকতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগর, পৃথিবী, সূর্য, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় সংসদ ইত্যাদি। ব্যক্তির মতো এরাও জনপ্রিয়তা নামক অদৃশ্য প্রত্যয়ের আনন্দ উপভোগ করে। 
এ অর্থে এরাও এক রকম ব্যক্তি। 
আইনও তা বলে।

স্বাভাবিক পরিচিতি নিশ্চিত করার জন্য জন্মের পর যে শব্দে ডাকা হয় সেটি সাধারণ নাম। সাধারণ নাম ছাড়াও একজন ব্যক্তির অনেকগুলো পরিচয় থাকে। সুনাম বা দুর্নাম যত বিস্তৃত হয় নামের সংখ্যাও তত বেড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ একজন কবি, একজন সাহিত্যিক, একজন ঔপন্যাসিক, একজন দার্শনিক, একজন নোবেল বিজয়ী, একজন ভারতীয়, একজন গায়ক, একজন্য নাট্যকার, একজন পটুয়া- - -  এভাবে অনেকগুলো, বলা যায় অসংখ্য প্রত্যয়ে তাঁকে অভিষিক্ত করা যায়।

কর্মের সাথে নামের সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পক যেমন গভীর ও একমুখী-গাণিতিক তেমন আবার হতে পারে পুরো উল্টো। 

কর্ম ব্যক্তির পরিচয়কে যথাযথভাবে পরিস্ফূট করে। হিটলার এবং মাদার তেরেসা নাম দুটো দিয়ে যথাক্রমে হিংস্রতা ও মানবতা প্রকাশ করা যায়। মিরজাফর নাম তো এখন একটি দোষ হিসাবে আখ্যায়িত। কয়জনই বা জানেন একজন ব্যক্তির নাম হতে মিরজাফর শব্দটির উৎপত্তি! অথচ সবাই জানেন মিরজাফর একটি ঘৃণ্য শব্দ, এর অর্থ প্রতারক, ষড়যন্ত্রকারী, নিকৃষ্ট ব্যক্তি, বিবেকহীন, নরপিশাচ-জাতীয় ব্যক্তি প্রভৃতি।

জনপ্রিয়তা ব্যক্তিকে না কি ব্যক্তির নামকে ঘিরে আবর্তিত সেটি নিয়ে সুক্ষè বিতর্ক রয়েছে। তবে ব্যক্তির উপর জনপ্রিয়তা বিশেষণটি আরোপ হলে নামের প্রসার ঘটে। ব্যক্তির আগে যখন নাম ছুটতে শুরু  করে তখন শুরু হয় জনপ্রিয়তা অর্জনের বা জনপ্রিয়তা বর্জনের পালা। ব্যক্তির আগে ব্যক্তির নাম যত দ্রুত ছুটতে পারে ব্যক্তির জনপ্রিয়তা বা জন-অপ্রিয়তা যথাক্রমে তত দ্রুত বাড়ে বা কমে।

ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে নামের পরিচিতি ঘটে সাধারণ মানুষের। ব্যক্তির আগে নামের পরিচিতি ঘটাতে না পারলে প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা আসে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বচক্ষে দেখেছেন এমন লোকের চেয়ে কখনও দেখেননি এমন লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। তবু তিনি অসংখ্য লোকের কাছে পরিচিত। তাঁর পরিচিতি ব্যক্তিগত নামক গ-িকে ছড়িয়ে যেতে পেরেছে। যিনি ব্যক্তিগত প্রকাশের চেয়ে নামের মাধ্যমে সর্বাধিক ও দ্রুত পরিচিত, মোটকথা তিনি তত বেশি জনপ্রিয়। যখন ব্যক্তিগত পরিচিতের সঙ্গে নামের পরিচয় বেশি হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে জনপ্রিয়তা অর্জিত হচ্ছে। অবশ্য একই কথা দুর্নামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

লোকে বলে- কাল হয়েছে গত, কালের মুখে মোত। 
জনপ্রিয়তা বলে, কাল হয়েছে গত, আসবে শত শত। জনপ্রিয়তার কাছে শত শত কাল ব্যক্তি চির বর্তমান হয়ে থাকে। মোজেসের কথা বলা যায়। তিনি তার জীবনকালে তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না। এখন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমান সবার কাছে তিনি প্রিয়। জনপ্রিয়তা বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎÑ এ তিনটি সময়জ্ঞাপক শব্দকে  একাকার  করে দেয়।  

যে ব্যক্তির নাম নিজ বিদ্যমানতার চেয়ে বেশি আগে ছুটে সে ব্যক্তি তত বেশি জনপ্রিয়। যার নাম ব্যক্তির অনেক পিছন হতে দৌড় শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত ক্রমশ বিস্তৃত সে ব্যক্তির জনপ্রিয়তা তত বেশি স্থায়ী, তত বেশি ব্যাপক। 
তবে স্থায়িত্ব আর ব্যাপকতা এক নয়।
প্ল্যাটো খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭ অব্দে জন্মগ্রহণ করেছেন। এখনও তিনি জনপ্রিয়। অনেক পিছন হতে শুরু করে এখনও তার নাম বর্তমান, এটি তার জনপ্রিয়তার স্থায়িত্বের পরিচায়ক।
কোনও ব্যক্তির নাম ব্যাপক হলে যে স্থায়ী হবে আবার স্থায়ী হলে যে ব্যাপক হবে তা সবসময় ঠিক না। নিউটনের জনপ্রিয়তা যত স্থায়ী তত ব্যাপক নয়। শিক্ষিত লোকের মধ্যে তার নাম সীমাবদ্ধ। আবার নাম ব্যাপক হলে যে স্থায়ী হবে তাও ঠিক নয়।
অমর্র্ত্য সেনের চেয়ে শাহরুখের খানের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। কিন্তু শাহরুখের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হলেও তা অমর্ত্য সেনের তুলনায় অনেক কম স্থায়ী। হুমায়ুন আহমেদের চেয়ে আহমদ ছফার জনপ্রিয়তা কম কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের জনপ্রিয়তা মৃত্যুর পর অনেক কমে গেছে কিন্তু আহমদ ছফার জনপ্রিয়তা গেছে বেড়ে।
সভার পরিচিতি পর্বে প্রায় দেখা যায় সংজ্ঞা বিভ্রাট।
মানুষ সাধারণত পরিচয় দেন আমিত্বে।
আমি অনুসিন্থিয়া, আমি আলিম, আমি জাফর ইত্যাদি। 
এ উত্তর ঠিক নয়।
আমি অনুসিন্থিয়া নই, আমার নাম অনুসিন্থিয়া। 
ব্যক্তি কখনও নাম হতে পারে না। অথচ আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত  লোক ব্যক্তিকে নামে পরিণত করে দেন। অনুষ্ঠানে লম্বা গলায় পরিচয় দেন- আমি রিজিয়া, আমি রহমান। অথচ আপনি তা নন। 
আমি মানুষ, আমি পুরুষ, আমি ডাক্তার, আমি একজনের স্বামী, আমি একজন বাংলাদেশি, আমি একজন যুবক, আমি একজন ভদ্রলোক- এ রকম হাজার হাজার, লাখ লাখ বলা যায়। তাই এভাবে আমি দিয়ে নিজের নাম প্রকাশ করে পরিচয় দিতে যাওয়া শুধু বোকামি নয়, অজ্ঞতাও বটে।সুতরাং যারা বলেন আমি জাফর, তারা কিন্তু ভুল নয় মিথ্যাও বলেন। 
বলতে হবে আমার নাম জাফর, আমার নাম কামাল, আমার নাম ইরন।

নাম কী জন্য?
পশু আর মানুষের চারিত্রিক তফাৎ দিতে গেলে এটি প্রথমেই লিখতে হবে। 
মানুষ জনপ্রিয়তার জন্য পাগল, পশুতে এ বোধ নেই। খাদ্য মানুষের দৈহিক আহার, সংস্কৃতি মনের আর প্রশংসা পরিচিতির আহার।
খাদ্য যত ভালো হয়, দেহ তত পুষ্ট হয়। সংস্কৃতি যেখানে উন্নত, মন সেখানে প্রফুল্ল। গুণাবলী যেখানে প্রবল সুনাম সেখানে জ্বলজ্বল। সুনাম অর্জনের পূর্বে গুণাবলী অর্জন আবশ্যক। কারণ গুণাবলী জনপ্রিয়তার পুষ্টি। তবে জনপ্রিয়তা আর পরিচিতি এক নয়। সব জনপ্রিয়তা পরিচিতি সব পরিচিতি জনপ্রিয়তা নয়। জনের সঙ্গে প্রিয় পরিচিতি হচ্ছে জনপ্রিয়তা। এখানে মানুষ ব্যক্তিকে কল্যাণকর চেতনায় গ্রহণ করে। পরিচিতির ক্ষেত্রে অকল্যাণকর পরিচিতিও হতে পারে। যেমন হিটলার, মীরজাফর, মুসোলিনি ইত্যাদি নাম অকল্যাণকর হিসেবে চিহ্নিত। তবে যথেষ্ট পরিচিত। এ পরিচিত কিন্তু জনপ্রিয়তা নয় বরং উল্টো।
আবার জনপ্রিয় ব্যক্তি যে সবসময় মানব সমাজের সর্বজনীন অনুকূল হবে তা নয়। ধর্ম প্রচারকেরা সংশ্লিষ্ট অনুসারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় তবে তাদের নিঃñিদ্র অনুসরণ মানব সমাজের বিকাশের অনুকূল ছিলÑ এমন কোনও তথ্য আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এক ধর্মাবলম্বী অন্য ধর্মের প্রচারককে নিকৃষ্ট হিসেবে ঘৃণা করে। নিজেদের ছাড়া অন্য সব বাতিল করে দেয়। এক ধর্মের অনুসারীরা দিব্যি ফুলকে অন্য ধর্মের গ্রন্থকে অবমাননা করে।

জনপ্রিয়তার সুফলভোগী কে?
দেহ ও মন দুটোই জনপ্রিয়তার সুফলভোগী।  
মানগত ও পরিমাণগত দিক দিয়েও জনপ্রিয়তাকে ভাগ করা যায়। 
হুমায়ুন আহমদের উপন্যাস একটি শ্রেণির লোকের কাছে বেশ জনপ্রিয় কিন্তু সাহিত্যমান শুন্য। আবার এমন অনেক লেখক আছেন যাদের লেখা জনপ্রিয় নয় কিন্তু সাহিত্যমানে প্রবল। 
মোটা চাল বাজারে বেশি বিক্রি হয়, সরু চাল কম। তার মানে মোটা চালের চেয়ে সুরু চালের কদর কম তা নয়। সরু চাল ভোগের যোগ্য লোকের অভাবই সরু চাল কম বিক্রির কারণ। তেমনি বলা যায় হুমায়ুন আহমেদের বই নিয়ে। এটি অনেকটা মোট চালের মতো সস্তা।

জনপ্রিয় হলে গুণগত মান বেশি লাগবে তা-ও সবসময় সত্য নয়। বরং অনেক সময় গুণগত মান জনপ্রিয়তাকে কমিয়ে দেয়। কারণ মানসম্মত কাজের জন্য মানসম্মত ভোক্তা প্রয়োজন। তাই তো আহমদ ছফার চেয়ে হুমায়ুন আহমদ জনপ্রিয়। কথা সাহিত্যিক শাহেদুল হককে কয়জনই বা চেনেন।

গণতান্ত্রিক জনপ্রিয়তা আর গুণতান্ত্রিক জনপ্রিয়তার মাধ্যেও বেশ পার্থক্য রয়েছে। গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তার পরিমাপ শুধু পরিমাণগত। কিন্তু গুণতান্ত্রিক জনপ্রিয়তায় পরিামাপের প্রধান বিবেচ্য  কোয়ালিটি, এখানে পরিমাণ অবশ্যই গ্রাহ্য কোনও প্রত্যয় নয়।

জনপ্রিয়তা অর্জনের অনেক কৌশল আছে। তন্মধ্যে ব্যতিক্রম সবচেয়ে সহজ উপায়।
ব্যতিক্রমই মানুষকে বেশি আকর্ষণ করে। তাই জনপ্রিয়তাকাক্সক্ষীরা লক্ষ্যে যেতে ব্যতিক্রম নামক বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেয়। এটি মিডিয়াকেও আকর্ষণ করে। 
আবার মিডিয়ার সঙ্গে রয়েছে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। মানুষ যেখানে মিডিয়াও সেখানে। মিডিয়া মানুষের গোলাম। সত্য সেখানে কোন ফ্যাক্টর নয়। 
এজন্য মিডিয়া গুজব দ্বারা সহজে প্রভাবিত হয়। একটা দেশের সংবাদপত্র দ্বারা সে দেশের মানুষের মান খুব সহজে অনুধাবন করা যায়।

পরিচিতির দুটি রূপ; একটি সুনাম অন্যটি দুর্নাম। সুনাম কাক্সিক্ষত তবে  র্দুনামটাই মানুষকে অধিক আপ্লুত করে, আকর্ষণীয় রসনায় উদ্বেল করে। মিডিয়াগুলোতে কারও দুর্নাম প্রকাশ পেলে জনগণ ঝুকে পড়ে। এমনভাবে পড়ে যেন বহুদিন পর সুন্দরী প্রেমিকা আবার ফিরে এসেছে। সুনাম সংক্রান্ত সংবাদ পাঠকের কাছে তেমন পাত্তা পায় না। এটি স্বামীর কাছে স্ত্রীর ন্যায় কিংবা স্ত্রীর কাছে স্বামীর ন্যায় বিরক্তিকর একটি পৃষ্ঠা। এমন বিষয় কেউ আগ্রহে নিতে চায় না। তাই সংবাদপত্রও কারও সুনাম প্রকাশে তত আগ্রহ দেখায় না। এজন্য  বলা হয় দুর্নাম বাতাসের আগে ছোটে।

ব্যক্তি মরে যায়, জনপ্রিয়তা মরে না। ব্যক্তি মরে গেলে আত্মা মরে যায়। চিন্তা-চেতনা সবকিছু বিনাশ হয়ে যায়। কিন্তু জনপ্রিয়তা থেকে যায়। আত্মাকে বাঁচতে হলে শরীরের আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু জনপ্রিয়তার জন্য শরীরের প্রয়োজন নেই, মনও নি®প্রয়োজন। এমনকি অস্তিত্বেরও প্রয়োজন নেই। ভূত, আত্মা, ঈশ্বর, পৌরাণিক কাহিনী প্রভৃতি অস্তিত্বহীন হলেও জনপ্রিয়তা বা জন-অপ্রিয়তায় চরম শক্তিশালী।
তাই জনপ্রিয়তা আত্মার চেয়েও প্রবল একটি অধ্যায়।
মোজেস মারা গিয়েছেন খ্রিস্টপূর্ব ১২৩৭ অব্দে। এখনও তিনি প্রবল জনপ্রিয়। দিন দিন তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
তাই জনপ্রিয় হবার জন্য অস্তিত্বের প্রয়োজন না-ও হতে পারে। অস্তিত্বহীন বিষয়ও জনপ্রিয় হতে পারে। বরং ঠিকমতো উপস্থাপন করতে পারলে অস্তিত্বহীন বিষয়ের জনপ্রিয়তা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কারণ মানুষ পরিচিত কাউকে সহজে জনপ্রিয় করে দিতে হীনম্মন্যতায় ভোগে। তাই হাতের চেয়ে কবরে ফুলের তোড়া বেশি যায়; জীবিত লেখকের চেয়ে মৃত লেখকের বই বেশি বিক্রি হয়।

ভূতের অস্তিত্ব নেই, কিন্তু ভূত কত জনপ্রিয়। 
সত্যাশ্রয়ী জ্ঞানীরা বলেন ঈশ্বরের অস্তিত্বও ভূতের মতো। 
তবু ঈশ্বর কত জনপ্রিয়।
বিশ্বসাহিত্যে নাটক-উপন্যাসে এমন অনেক অলিক চরিত্র আছে যারা কখনও প্রকৃতপক্ষে শরীর ধারণ না করেও প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
সত্যাশ্রয়ীদের কাছে ধর্ম লৌকিক উপখ্যান মাত্র। 
কিন্তু অনুসারীদের কাছে বাস্তব, কঠোর সত্য।
জনপ্রিয়তা আপেক্ষিক শব্দ। 
এর সর্বজনীনতা খুব একটা চোখে পড়ে না। মুহাম্মদ মুসলমানগণের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার কিন্তু ইহুদি খ্রিস্টানদের কাছে নয়। রাজনীতিক নেতাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এক দলের নেতারা অন্যদলের নেতৃবৃন্দকে ঘৃণার চোখে দেকে ঠিক ধমের মতো।
কারণ ধর্ম ও রাজনীতি উভয়ের উদ্দেশ্য পার্থিব সম্পদে নিজেকে ভারী করে তোলা। ধর্মে রহস্যময়তার পরিমাণ রাজনীতির চেয়ে বেশি। 
ধর্মে জোর জবরদস্তি আছে, রাজনীতিতে যার পরিমাণ ধর্মের চেয়ে অনেক কম। রাজনীতি বিপক্ষদলকে পার্থিব বঞ্চনায় ভীত করে তুলতে চায় কিন্তু ধর্মে বিধর্মীদের ভীত করে তুলতে চায় মারা যাওয়ার পর নৃশংস শাস্তির ভয় দেখিয়ে।

কাজী নজরুল ইসলাম ও এক দারোগার কাহিনি / ড. মোহাম্মদ আমীন

যাঁর অবিশ্বাস্য অবদান দুখু মিয়া নামক একজন পথশিশুকে রুটির দোকানের কর্মচারী হতে উদ্ধার করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় কবি হওয়ার সমুদয় সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তিনি পুলিশের একজন সদস্য, নাম কাজী রফিজ উদ্দিন। সাধারণ্যে যিনি দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন নামে সমধিক পরিচিত। দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন কোনো সাহিত্যকর্ম করেননি, কোনো কাব্য বা উপন্যাসও রচনা করেননি। তবু তিনি বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী ব্যক্তি হিসাবে অক্ষয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, ততদিন থাকবে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম এবং ততদিন বেঁচে থাকবেন কাজী রফিজ উদ্দিন। রফিজ উদ্দিন দারোগার এ অবদান পুরো পুলিশ বিভাগের বিমল গর্ব। সেদিন ত্রিশাল ছিল বাংলাদেশের অসংখ্য সাধারণ গ্রামের মতো একটি অখ্যাত গ্রাম।  কে জানত এই গ্রামটি শুধু একজন দারোগার সময়োচিত একটি সহানুভূতিমূলক কাজের জন্য বিশ্বমানচিত্রে অন্যতম একটি স্থান হিসাবে খ্যাত হয়ে উঠবে!  
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১১ জৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (২৫ মে, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও আর্থিক অনটনে থাকার কারণে বাবা-মা নজরুল ইসলামের নাম দিয়েছিলেন দুখুমিয়া। তাঁর পিতার নাম ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হলে জীবিকার খাতিরে নজরুলকে ‘লেটো’র দলে যোগ দিতে হয়। অল্প কিছুদিন পার ‘লেটো’ দল ত্যাগ করে পড়ালেখা শুরু করেন এবং দশ বছর বয়সে নিম্নমাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেন। এরপর তিনি জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে মক্তবে শিক্ষকতার চাকরি নেন। অল্প কিছুদিন পর মক্তবের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসানসোল চলে যান। আসানাসোল শহরে এসে আশ্রয় আর অনাহারে চরমভাবে বিপর্যস্ত দুখু একটি রুটির দোকানে কাজ নেন। রুটির দোকানে চাকরিকালীন দুখু মিয়া, রফিজ উদ্দিন দারোগার চোখে পড়েন। তিনি দুখু মিয়াকে মূলত বাড়ির কাজ-বাজ করার জন্য রুটির দোকান থেকে উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে যান। শুধু এ একটি কাজ করার জন্য দারোগা রফিজ উদ্দিন একলাইন সাহিত্যকর্ম না-করেও বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।  
দারোগা সাহেব আসানসোল থেকে দুখু মিয়াকে নিজ গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার দরিরামপুর গ্রামে নিয়ে আসেন। ত্রিশালে এনে তিনি নজরুলকে দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। এক বছর পর এখানকার পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে গেলে নজরুলকে চুরুলিয়ার রানীগঞ্জে শিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। এখানে নজরুল তিনবছর পড়ালেখা করেছিলেন। এসময় প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। কবি নজরুল তখন ওই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই, তিনি যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে নজরুল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে চাকুরি নিয়েছিলেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বাঙালি পল্টন ভেঙে গেলে তাঁর সৈনিক জীবনের অবসান ঘটে। চাকুরিরত অবস্থায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম গল্প ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ কলকাতার ‘সওগাত’’ পত্রিকায় জৈষ্ঠ ১৩২৬ সংখ্যায় এবং প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ কলকাতার ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য’ পত্রিকায় শ্রাবণ ১৩২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এভাবেই জাতীয় কবির বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ‘বিজলী’ ও ‘মোসলেম’ পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসাবে খ্যাত হয়ে উঠেন।    
আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে এই কাজীর সিমলা গ্রামের অধিবাসী কাজী রফিজ উদ্দিন সাহেব যখন চাকরিসূত্রে ভারতের বর্ধমানে ছিলেন তখন দুখুমিয়া নামের এই কিশোরটি রুটির দোকানে কাজ করে রাতে দারোগা সাহেবের বাসার বারান্দায় ঘুমাতে আসত। তাঁর চোখে-মুখে তখনই সুপ্ত প্রতিভার ছাপ দেখে দারোগা সাহেব নববধুর পরামর্শক্রমে দয়াপরবশ হয়ে সেই কিশোরকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। বাড়ির টুকটাক কাজ করবেন এবং স্কুলেও ভর্তি করিয়ে দেবেন।তবে নজরুলের প্রতিভা দেখে দারোগা সাহেব, তাকে সার্বক্ষণিকের জন্য ছাত্র হিসাবে অধ্যয়নের সুযোগ করে দেন। এটি  ছিল ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের কথা। কিশোর নজরুলকে দারোগা সাহেব কাজীর সিমলায় তাঁর নিজ বাড়ি থেকে অনুমান ৫ মাইল দূরে তখনকার নবপ্রতিষ্ঠিত নামকরা দরিরামপুর ইংলিশ হাই স্কুলে (বর্তমান নজরুল একাডেমি) ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কাজীর সিমলা থেকে দরিরামপুর স্কুল দূরে হওয়ায়  স্কুলের কাছাকাছি বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে জায়গির ঠিক করে দেন দারোগা সাহেব। এখন বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি থেকে যে পাকা রাস্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার পাশ দিয়ে ত্রিশাল বাজারে গিয়েছে, তখন এটি আইলের মতো  দু-পায়ে-হাঁটা রাস্তা ছিল। কবি স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং পড়ার ফাঁকে এ বটতলায় বসে সমবয়সী বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে বাঁশি বাজাতেন। এখন এ শুকনি বিলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।   
ত্রিশাল অবস্থানকালে নজরুল, প্রায় বছরখানেক বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে ছিলেন। তবে এ ঘটনা দীর্ঘদিন অনেকের অজানা ছিল। ১৯৬৪-৬৫ খ্রিস্টাব্দের আগে বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িরও কেউ জানতেন না যে, বিখ্যাত কবি ও লেখক কাজী নজরুল ইসলামই সে দুখুমিয়া। ওই সময়ে নজরুল জয়ন্তী উদ্‌যাপনের জন্য ময়মনসিংহ জেলার তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি এ নাজির ওই এলাকায় যান এবং জিজ্ঞাসা করতে করতে এটি আবিষ্কার করেন। ত্রিশালেও দুখুমিয়া নামে একাধিক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সঙ্গে বর্ধমান, আসানসোল, চুরুলিয়া যেমনভাবে গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কাজির সিমলা, দরিরামপুর, শুকনি বিলের নামাপাড়ায় অবস্থিত বটতলা, বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি প্রভৃতি। আর এজন্য একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী হচ্ছেন দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন।  
দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন সাহেব দুখুমিয়াকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন বলেই তাঁকে আর জীবিকার তাগিদে লেটোর দলে থাকতে হয়নি, মক্তবে মুয়াজ্জিন হিসাবে আজান দিতে ও পড়াতে হয়নি সর্বোপরি রুটির দোকানে কাজ করতে হয়নি। দারোগা সাহেব তখন যদি দুখু মিয়াকে রুটির দোকান থেকে এনে স্কুলে ভর্তি করিয়ে না-দিতেন তাহলে আমাদের জাতীয় কবি রুটির দোকানের কর্মচারী হয়ে থেকে যেতেন। দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন নজরুল স্কুলে ভর্তি করিয়ে তার শিক্ষার ভিতকে মজবুত কওে দিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় নজরুল বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন।  এ সময় দুখু মিয়ার ভ্রমণ ব্যয়সহ যাবতীয় খরচ দিয়েছেন দারোগা কাজী রফিক উদ্দিন।  কবিগুরু যখন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করে বিশ্বকবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, তখন কিশোর নজরুলকে রুটির দোকানের কাজ থেকে ছাড়িয়ে দারোগা সাহেব কাজীর সিমলায় পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নিয়ে আসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। নজরুলকে সেদিন যদি কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগা ত্রিশালে নিয়ে না আসতেন, তাহলে তিনি কবি নজরুল হয়ে উঠতে পারতেন না। পুলিশের একজন সদস্য হয়েও দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন সুদূর আসানসোল থেকে দয়াপরবশ হয়ে একজন হতভ্যাগা কিশোরকে এনে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ পুলিশের নাম শুনলেই আমাদের মনে কেমন ভীতি সঞ্চার হয়। আজ থেকে একশ বছর আগে পুলিশের আচরণ এর চেয়েও খারাপ ছিল। কিন্তু দারোগা রফিজ উদ্দিন এ অবস্থার মধ্যেও  যা করেছেন তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো বিশ্বে বাংলাদেশের পুলিশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। সংগত কারণে কবি নজরুলের নামের পাশে স্বর্ণাক্ষরে কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগার নামও সমভাবে উচ্চকিত হবে।  
নজরুল যখন কপর্দকহীন অবস্থায় পথে পথে ঘুরছিলেন, একবেলা অন্নের জন্য রুটির দোকানে কাজ করছিলেন, রাতে শোয়ার জায়গা না-থাকায় একজনের ঘরের বারান্দায় ঘুমাতেন, যখন তাকে দেখার মতো কেউ ছিল না। তখন তার প্রতি একটি দরদি হাত এগিয়ে এসেছিল অনবদ্য ইতিহাস সৃষ্টির উল্লাসে- সে হাতটি ছিল একজন পুলিশ অফিসারের। জীবনে নিগৃহীত হতে হতে অবশেষে যিনি একজন দারোগার ভালবাসায় বিদ্রোহী কবি হয়ে উঠার সকল উপাদানে ঋদ্ধ হতে পেরেছেন তিলেতিলে।   
কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগা পথের শিশু দুুখু মিয়াকে দিয়েছেল রথের সন্ধান। যে রথ বেয়ে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে নজরুলের সৃষ্টি সম্ভারে। সত্যি পুলিশ জনগণের বন্ধু,  বাংলা সাহিত্য এ পুলিশ অফিসারের অবদান কখনও ভুলবে না। এমন অবদান কী ভুল যায়?