সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

উলুবনে মুক্তো / ড. মোহাম্মদ আমীন

উলুবনে মুক্তো

=======
২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের ঘটনা। আমি তথন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। আমার লেখা সদ্যপ্রকাশিত ‘অফিস আদালতে বাংলা লেখার নিয়মগ্রন্থটা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে সচিবপদে সদ্য যোগদানকারী জনাব শফিকুল আযমকে দিতে যাই। এর আগে  মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, গায়ক ও রবীন্দ্র গবেষক  
মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে ওই বইটি দিচ্ছেন লেখক
ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম। তিনি বদলি হয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যোগদান করেছেন। তাঁর পরিবর্তে অতিরিক্ত সচিব জনাব আযম, ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসাবে মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন।

অফিস কক্ষে তিনি একা। আরাম করে চেয়ারে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছেন। সালাম দিয়ে বললাম : কেমন আছেন স্যার?
কোনো কিছু না বলে তিনি নথিতে চোখ দেন। মনটা খারাপ হয়ে যায়। 
ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম হলে গভীর স্নেহে বলতেন : বসো, বাসো।এতক্ষণ পরে এলে? কোথায় ছিলে?
বসব না দাঁড়িয়ে থাকব ভাবছিলম। মনটা রবাহূতের মতো খচ খচ করছে। চোখে বালি পড়লে এমন লাগে।কিছুক্ষণ পর জনাব শফিকুল আযম চোখ তুলে বললেন : কিছু বলবেন?
আমি বইটা তার দিয়ে এগিয়ে দিয়ে বললাম : আমার লেখা বই, গতকাল প্রকাশিত হয়েছে।
ভালো।
আমি তাকে বইটা তার দিকে হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আরও এগিয়ে যাই। আমার কাণ্ড দেখে তিনি ঈর্ষা আর ঘৃণায় মুখটাকে বিকৃত করে সিগারেটে টান দিতে দিতে বললেন : আমি বই পড়ি এটা আপনাকে কে বলেছে?

তার প্রশ্নে আমি বিমূঢ়। 
এর কোনো জবাব নেই। তিনি বই পড়েন, এটা আমাকে কেউ বলেননি। পড়েন না, এটাও বলেননি। কিন্তু বই না পড়ে কী সচিব হওয়া যায়? আরও অনেক সচিবকে বই দিয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও দিয়েছি, মহামান্য রাষ্ট্রপতিকেও দিয়েছি। তারা তো এমন বলেননি! মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ বই পেয়ে গভীর মনযোগের সঙ্গে আধঘণ্টা পড়ে বলেছিলেন : চমৎকার। বইটা সরকারি কর্মকর্তাদের বাংলা বানানের সীমাবদ্ধতা নিরসনে বেশ কাজ দেবে। আমি তাঁর মন্তব্য শুনে পুলকিত হয়ে উঠেছিলাম।
সাধারণত লেখকরা নতুন কোনো বই প্রকাশ হলে কয়েকজনকে উপহার দেন। আমিও দিই। অফিসের সিনিয়র বস হিসাবে সচিব সবার আগে। তাই তার জন্য একটা বই এনেছিলাম। কিন্তু জবাব শুনে লজ্জায় আমার চেয়ে হাতের বইটা আরও বেশি কাঁপছিল।
 লেখাগুলো যেন তীরের মতো পাতা হতে ছুটে যেতে চাইছে।
এবার জনাব শফিকুল আযম সাহেবের অফিস কক্ষের চারিদিকে তাকিয়ে  আমি হতবাক। মনে হয় নতুন কোনো এক অনুর্বর মরুভূমি। রুমে অনেকগুলো আলমারি ও তাক। ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম সাহেবের সময়  আলমিরাগুলো বইপত্রে
ভূঁইয়া সফিকুল  ইসলাম ও লেখক
ভর্তি ছিলএখন সেখানে শূন্যতার হাহাকার সব বইপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একটা আলমিরার এক কোণে পাথরের কয়েকটা ক্রেস্ট। বাকি সবগুলো আলমারি শূন্য। ভূঁইয়া সাহেবের টেবিলে শোভা পেত দেশি-বিদেশি নানা বই। আলোচনা হতো কাজের ফাঁকে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে।
টেবিলে কোনো বইপত্র নেই। সিগারেটের দুটো প্যাকেট, একটি ম্যাচ এবং কয়েকটা ফাইল।

আলমারি আর টেবিলে বইপত্রের শূন্যতা দেখে মনে হচ্ছিল, এ কক্ষে আমি আগে আর কোনোদিন আসিনি। অথচ ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম সাহেব থাকাকালীন প্রতিদিন অন্তত একবার এসেছি। আসতে হয়েছে। না-এলে ডেকে এনেছেন। আলাপ হয়েছে কবিতার, সাহিত্যের, দেশের, উন্নয়নের এবং মানুষের।
বই জ্ঞানের বাহন। বইশূন্য ঘর প্রাণহীন জীবের মতো অসাড় এবং ক্রমশ গন্ধময় হাওয়া। আমার নাকে এসে তেমন দুর্গন্ধ আঘাত করতে শুরু করে। আলমারির শূন্যতা দেখে নিজেকে বড় অসহায় লাগছিল। এখান থেকে কত বই নিয়ে পড়েছি। ইস, কেন বইটা আনলাম! 
যদিও জনাব শফিকুল আযমের মতো ব্যবহার আর কোনো সচিবের নিকট থেকে পাইনি। তবু এরপর থেকে কাউকে বই উপহার দেওয়ার আগে পঞ্চাশ বার চিন্তা করব।
আলমারির মতো জনব শফিকুল আযম সাহেবের মাথাও হয়তো শূন্য। এজন্য অফিসে ধূমপান নিষেধ সত্ত্বেও দিব্যি সিগারেট টেনে যাচ্ছিলেন। বই পড়লে জানতে পারতেন- অফিস কক্ষে ধূমপান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

বসলাম না আর।
বইটা নিয়ে চলে এলাম নিজের রুমে।
উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর চেয়ে নিজের গালে নিজে দুটো থাপ্পর খাওয়া অনেক ভালোগবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন, মাতৃভাষা জ্ঞান, প্রাত্যহিক প্রয়োজন, শুদ্ধ বানান চর্চা এবং বিসিএস-সহ যে-কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটি লিংক :
শুবাচ লিংক
শুবাচ লিংক/২
শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১
শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২
শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩
নাটোর জেলার নামকরণ
চকরিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
মানিকগঞ্জ জেলার নামকরণ ও ঐতিহ্য
হাতিয়া উপজেলার নামকরণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য
পটুয়াখালী আগুনমুখা নদীর নামকরণ
ভেদরগঞ্জ উপজেলা ও ইউনিয়নসমূহের নামকরণ



রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৬

ড. মোহাম্মদ আমীন, বঙ্কিমচন্দ্র ও সাহিত্য চর্চা / মো: আব্দুস সালাম খান

মোহাম্মদ আমীনের চকরিয়ার ইতিহাস  অভয়নগরের ইতিহাস গ্রন্থে যে সকল চমৎকার তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা পড়ে মুগ্ধ হতে হয়। পুঁটি মাছের মুখ দিয়ে “ পৃথিবীতে একমাত্র  মানুষই নিজের মলমূত্র খায়  “ বলিয়ে যেভাবে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করা হয়েছে তাতে স্যানিটেশন সম্পর্কে  মানুষ  সচেতন না হয়ে পারে না।  তার গ্রন্থসমূহে অতীতকে জানার এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনার জন্য মানব সমাজকে সাহায্য করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সাহিত্য চর্চায় তার মেধা ও শ্রম কাজে লাগিয়ে মানব কল্যাণে তিনি আরও ব্রতী হবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তার সাধানা তাকে খ্যাতির উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করবে এটাই কামনা করি।
জনাব আমীনের লেখা  ‘বনমামলা দায়ের ও পরিচালনার কৌশল’ এবং ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ও আদেশনামা’ বইদুটো আমাদের সহকর্মীদের দৈনন্দিন কর্তব্যপালনে উপকারে আসবে। বই দুটো প্রশাসনে নিয়োজিত উদীয়মান কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রমে আরও সুদক্ষ করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। জনাব মোহাম্মদ আমীন আমাদের গর্ব। আমি তার চমৎকার লেখার প্রশংসা করছি। তার এ কর্ম প্রচেষ্টা অন্যদেরকে বই লিখতে অনুপ্রাণিত করবে।
কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনাব আমীনের সাহিত্য চর্চায় আমি মুগ্ধ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ম্যাজিস্ট্রেসির পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা করে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। ‘তিলোত্তমা হাতিয়া’ যিনি লিখেত পারেন তার পক্ষে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করা অসম্ভব নয়। তার জন্য আমি গর্ববোধ করি।

লেখক : মো: আব্দুস সালাম খান, প্রাক্তন সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও  রেক্টর, বিপিএটিসি, সাভার, ঢাকা এবং প্রাক্তন জেলাপ্রশাসক, চট্টগ্রাম।

ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ (আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের জবানিতে) স্বাধীনতা যুদ্ধের জীবন্ত দলিল / সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

‘ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ’ বইটা একনাগাড়ে পড়ে  শেষ করলাম। আসলে শেষ না করে উঠতে পারছিলাম না। ভালো লেগেছে তা বলাই বাহুল্য। এত ভালো লেগেছে যে, পড়তে  বইটা আমার চেতনায় স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধ সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। পড়তে
ড. মোহাম্মদ আমীন
পড়তে প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। তাই পাঠ শেষ করে কিছু আলোচনা লিখতে বসে যেতে বাধ্য হই। বইয়ের নায়ক সুবেদার মেজর আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের লড়াই নিশ্চিতভাবে এক গৌরবজনক অধ্যায়। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর এবং তাঁর মতো আরও অনেকের একাগ্র ও অকুতোভয় ভূমিকা আমাদের দিয়েছে মহান স্বাধীনতা। বিশেষ করে আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের সাহস, যুদ্ধকৌশল, দেশপ্রেম, পরিবার-পরিজনের প্রতি অগাধ দরদ, দেশের শত্রুর প্রতি বজ্রকঠোর অবস্থান ও মানবতাবোধ সত্যি মুগ্ধকর।
বইয়ে তেতুলিয়া নামের একটি জায়গার উল্লেখ পেলাম। আমারও যুদ্ধ করি তেতুলিয়া
অঞ্চল জুড়ে। তবে এ তেতুলিয়া আলাদা, এটা নাভারণ ও সাতক্ষীরার মধ্যবর্তী অঞ্চল। এখানকার লড়াইয়ের পরিবেশটিও ছিল আলাদা। এখানকার ইপিআর যারা ছিলেন, তারা কখনও বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে কোনো হামলায় (রেইডে) অংশ নিতেন না। তারা আমাদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) পাঠাতেন। মোট পাঁচটি অভিযানে আমি ও আমার নিকট বন্ধুরা সক্রিয় অংশ নিয়েছিলাম। যার চারটিতে নিশ্চিতভাবে সফল হই।বাকিটায় আমাদের সাংঘাতিকভাবে ক্ষতি হয়। কজন মারা যান, তাও কোনোদিন জানতে পারিনি। সম্ভবত কয়েকজন পালিয়ে চলে যান- যারা ক্যাম্পে রিপোর্ট করেননি। কয়েকজন মারাও যান। একমাত্র আমি পালিয়ে এসে ক্যাম্পে রিপোর্ট করি। ঘটনার পর আমাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ‘আহমদ হোসেন বীরপ্রতীকের জবানিতে ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ’ বইটি পড়ে শেষ করার পর মনে হলো- একটা যুদ্ধের সিনেমা দেখা শেষ হয়েছে। সিনেমা নয়, যেন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধে অংশ না নিয়েও আপিন চমৎকারভাবে যুদ্ধের ছবি এঁকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের এমন চমৎকার ও প্রত্যক্ষদর্শীর মতো নির্ঝর বর্ণনাসম্বলিত আর কোনো বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
যুদ্ধ সবসময় উভয়পক্ষ জয়ের জন্য করে। আমরা বাঙালি, তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা
আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক পদক নিচ্ছেন
ছিল আমাদের জীবনের চেয়েও বড়। এজন্য আমরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে সর্বদা প্রস্তুত ছিলাম। তবে মেজর, তার স্ত্রী ও শিশুপুত্রের হত্যার ঘটনা মনকে সাংঘাতিকভাবে আড়ষ্ট করে দিয়েছে, মেনে নিতে পারছি না। এটি আবারও প্রমাণ করেছে, যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া সবার জন্য সবসময় ক্ষতিকর। এ একটি ঘটনা, বইয়ে আলোচিত সব আনন্দঘন ঘটনাকে ছাপিয়ে মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। যদিও আমি তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। তারাই আমাদের সহযোদ্ধাদের হত্যা করেছে। অন্যায় যুদ্ধ আমরা যেন আর না করি। দুপক্ষই যুদ্ধের ব্যাকরণ ভাঙলে হানাদার আর মুক্তিযোদ্ধার পার্থক্য থাকে না। আপনার বইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে একটি জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।
লেখক সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস একজন মুক্তিযোদ্ধা, দলিত আন্দোলনের নেতা।বাংলাদেশের যশোর জেলার মশিয়াহাটি গ্রামে বিশ বছর পর্যন্ত ছিলেন।  এখান বাস করেন ভারত। তার বর্তমান ঠিকানা: নতুন পল্লী, ডাকঘর : মছলন্দপুর, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ। 

হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত / শাহজাদা শামস ইবনে শফিক

হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখকের আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। হাতিয়ার ইতিহাস লিখে, লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল অ্যাসোশিয়েশন এর  সম্মাননা। আমরা জানি, হাতিয়া বাংলাদেশের একটি দ্বীপ-উপজেলা। একসময় এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নানা শাসকের উত্থান-পতন, পর্যটকদের আগমন-বহির্গমন প্রভৃতি বিষয়ের মূলভূমি ছিল হাতিয়া বা প্রাক্তর সাগরদ্বীপ বা
সাগরদি। এ হাতিয়ার ইতিহাস লিখেছেন ড. মোহাম্মদ আমীন। হাতিয়া অতি প্রাচীন জনপদ, ড. আমীনের মতে প্রায় ৬ হাজার বছর। এমন একটি প্রাচীন জনপদের ইতিহাস এতদিন কেউ রচনা করেননি, এটি ছিল সত্যি দুঃখজনক। কেন জনাব আমীন হাতিয়ার ইতিহাস রচনা উদ্যোগী হলেন সেটি ‘তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থ’ এর ভূমিকা পড়ে কিছুটা জানা যায়। তিনি লিখেছেন : - -  ১৯৯৭ খ্রিস্টব্দে দ্বীপায়ণ, ১২-তম সংখ্যার সম্পাদক, হাতিয়া জনকল্যাণ সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক ও তরুণ লেখক জনাব মো: নাজিম উদ্দিন তাঁর লেখা প্রবন্ধ ‘হাতিয়ার ভাষা ও মুসলিম আদি বসতি’ প্রবন্ধের উপসংহারে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় হাতিয়ার ইতিহাস রচনার জন্য অনাগত কাউকে উদাত্ত আহবান জানানোর পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এ আহবানের আন্তরিকতা ও আবেগময় ক্লেশ আমার মনে দাগ কাটে। হাতিয়াবাসী না হই, বাংলাদেশি তো বটে। লেখালেখি আমার সখ জানতে পেরে হাতিয়া উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চেয়ারম্যানবৃন্দ ২০০০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে আমার অফিসে এসে হাতিয়ার উপর একটি গ্রন্থ লেখার অনুরোধ করে। নাজিমের আহবান এবং চেয়ারম্যান বৃন্দের অনুরোধের স্বতঃস্ফুর্ত আন্তরিকতায় উদ্বেল হয়ে উঠে আমার সখ এবং অবসর কাটানোর মৌনতা। এমন সুযোগ ছাড়ে কে?

 ড. মোহাম্মদ আমীন উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন ‘তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ শিরোনাম দিয়ে হাতিয়ার ইতিহাস লিখেন। আঞ্চলিক ইতিহাসের অগ্রায়নে এটি ছিল একটি অমূল্য সংযোজন। অপূর্ব সুন্দর হাতিয়ার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে জনাব আমীন হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন : ~চাকুরী সুবাদে হাতিয়া, নইলে হাতিয়ার মতো এত সুস্মিত দ্বীপ-খন্ডটি ও তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অন্তরালিত   ইতিহাসের স্মারকটি  আমার চেনাই হতো না কোনদিন, ঠিক যেমন চেনা বা দেখা সম্ভব হচ্ছে  না দেশের আরও অনেক নয়নাভিরাম প্রত্যন্ত এলাকা। হাতিয়া এসেই আমি অবাক, এ শুধু ভূখন্ড নয়, ভূ-স্বর্গ, বিস্ময়ের অপার মৌনতায় পরিপূর্ণ অবকাশের মনলোভা সোহাগ, মাখনের মত সোঁদা সোঁদা গন্ধে তুলতুলে অতুল। মুহূর্তের ক্ষণগুলো যুগ যুগ জিইয়ে রাখা জলের মাঝে ভাসমান একটি প্রমোদতরী যেন। স্বপ্ন বিলাসের অত্যুত্তম নিদাঘ হয়ে ডাকছে, “এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে --। আমি এলাম”। ড. মোহাম্মদ আমীন একজন অসাধারণ ইতিহাস রচয়িতা। আঞ্চলিক ইতিহাসে তিনি যেমন নিগুঢ় তেমনি বিচক্ষণ। নামকরণের মাধ্যমে কীভাবে প্রকৃত ইতিহাসকে টেনে তুলে আনা যায় আবার কীভাবে ইতিহাসের মাধ্যমে নামকরণ বৃত্তান্তকে স্পষ্ঠীকরণ করা যায়- তা, তাঁর ইতিহাসবিষয়ক বইগুলো না-পড়লে বোঝা যাবে না। এ ইতিহাস গ্রন্থটি রচনার জন্য তিনি
পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার। আঞ্চলিক ইতিহাসে অসামান্য অবদানের জন্য ইউরোপের মেসেডোনিয়া হতে তাকে দেওয়া হয়েছে সম্মান। তিনি হাতিয়ার ইতিহাস রচনার জন্য “ হেরিডোটাসা ফাদার অব দ্যা হিস্ট্রি অ্যাওয়ার্ড/২০১৫” অর্জন করেছেন। তাঁর অন্যান্য আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থের মধ্যে ‘বাংলাদেশের জেলা উপজেলা ও নদনদীর নামকরণের ইতিহাস, চকরিয়ার ইতিহাস, ভেদরগঞ্জের ইতিহাস, অভয়নগরের ইতিহাস, অভয়নগর প্রোফাইল, কক্সবাজারের ইতিহাস, চন্দনাইশের ইতিহাস  প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।  বিশেষ করে হাতিয়ার ইতিহাস লিখে তিনি দ্রুতভাঙ্গনশীল হাতিয়াকে প্রকৃত অর্থে চিরদিনের জন্য স্থায়ী করে রেখে গিয়েছেন। তিনি ওই ইতিহাস না-লিখলে হয়তো এখনও হাতিয়ার ইতিহাস লেখা হতো কিনা সন্দেহ। এভাবে হয়তো হাতিয়া হারিয়ে যেত অনেক জনপদের ন্যায় জলের তলে। হাতিয়ার উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন ড. মোহাম্মদ আমীন গ্রন্থটি রচনা করেন। এটি হাতিয়ার উপর লেখা প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ এবং একমাত্র ইতিহাস।

ইতিহাস বলা হলেও এ গ্রন্থে রয়েছে নৃতত্ত্ব, জনমিতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রশাসন, ভূপ্রকৃতি, নামকরণসহ আরও নানা বিবরণ। প্রতিটি বিবরণ তথ্যসমৃদ্ধ এবং সর্বজনীন হিসাবে ইতোমধে স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এমন একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করায় ড. আমীন সম্মানজনক এ পুরস্কার লাভ করেন। ড. আমীনের হাতিয়ার ইতিহাস গ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব ও রেক্টর, বিপিএটিসি বলেন,  “তিলোত্তমা হাতিয়া’ যিনি লিখেত পারেন তার পক্ষে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করা অসম্ভব নয়। তার জন্য আমি গর্ববোধ করি।”  
বইটির প্রকাশক হাতিয়া জনকল্যাণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষনা ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম। এমন একটি বই প্রকাশ করায় হাতিয়া জনকল্যাণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম নিশ্চয় গ্রন্থের মতো কালজয়ী হয়ে থাকবে।

আলোচ্য ব্লগের লেখক : শাহজাদা শামস ইবনে শফিক, সম্পাদক, সাপ্তাহিক দিগন্ত ধারা ।

শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬

ড. আবদুল করিমের চোখে ড. আমীনের চকরিয়ার ইতিহাস / আনোয়ার হোসেন কন্ট্রকটার


চকরিয়ার বিজ্ঞ উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মোহাম্মদ আমীন চকরিয়া নিয়ে কাজ করছেন শুনে আমি বেশ খুশি হই। অফিস সময়ের পর তিনি বেরিয়ে পড়েন ইতিহাসের সন্ধানে। এটি যদি হয় তো, তা হবে আমাদের জন্য এক বিরাট পাওয়া। তবে অনেকে সমালোচনাও শুরু করেছেন। ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে বই লেখেন। কয়েকজন শিক্ষক, সাংবাদিক ও পেশাজীবী 
ড. আবদুল করিম (১৯২৮-২০০৭)
আমাকে জনাব আমীন সম্পর্কে কিছু আকর্ষণীয় তথ্য দিলেন। ছাত্র জীবন হতে তিনি লেখালেখি করে আসছেন। চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলায় বাড়ি, বেশ ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান। আমি রাজনীতি করি, তখন চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সাহস করে একদিন উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে গেলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, চকরিয়ার ইতিহাস রচনায় যে কোনোভাবে হোক কিছু অবদান রাখা। চকরিয়ার ইতিহাস রচনায় আমার আগ্রহ শুনে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন তিনি।আমার হাতে একটা পাণ্ডুলিপি দিয়ে দেখতে বললেন। পাণ্ডুলিপি দেখে আমি অবাক। ইতিহাস তো হয়েই গেছে।এখন কেবল ছাপা। কীভাবে এটি সম্ভব হলো? মনের প্রশ্ন মনে রেখে দিই। তাঁর সম্পর্কে যা শুনেছি, তার অর্ধেক সত্য হলেও এটি তেমন কঠিন নয় জনাব আমীনের কাছে।
বিনয়ের সঙ্গে বললাম, যদি অনুমতি দেন তো, আমি বইটি প্রকাশ করব।আমার কথায় তিনি রাজি হলেন।
প্রকাশ করে ফেললাম ‘চকরিয়ার ইতিহাস’। প্রকাশ হওয়ার চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। আলোচনা, সমালোচনা, প্রশংসা- সব। আমি ইতিহাস বুঝি না। বইটি কেমন হয়েছে জানার জন্য একদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এশিয়া মহাদেশের বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আবদুল করিম সাহেবের কাছে নিয়ে যাই। ড. করিম আবার আমার আত্মীয়। তিনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর  থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরউপাচার্য পদে নিযুক্ত ছিলেন।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আবদুল করিমের (জন্ম ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১ জুন গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলা বাঁশখালী উপজেলা চাপাছড়িতে ভিন্ন উপজেলা হলেও, ভৌগলিক দিক হতে উভয় উপজেলার অনেক মিল ছিল। একসময় নাকি দুটো উপজেলা অভিন্ন ছিল।যাই হোক, ড. করিম, জনাব মোহাম্মদ আমীনের লেখা ‘চকরিয়ার ইতিহাস’ বইটি পড়তে শুরু করেন। আস্তে আস্তে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি বইয়ে একাগ্র হয়ে পড়েন। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর বই হতে মুখ তুলে বলেন : মোহাম্মদ আমীন কে? 
আমাদের উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট।প্রশাসন ক্যাডারের লোকের পক্ষে কীভাবে এমন তথ্যবহুল ইতিহাস লেখা সম্ভব হলো? এরা তো এত জ্ঞানী ও দূরদর্শী নন। এমন ছেলে কেন অ্যাডমিন ক্যাডারে গেল?প্রশংসা শুনে আমি খুশিতে হাসছি। ড. করিম বলেই যাচ্ছিলেন : আনোয়ার, এ তো অবিশ্বাস্য, আমি তো এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস আর দেখিনি। অ্যাডমিন ক্যাডারেও তাহলে মেধাবীদের কেউ কেউ যায়!ড. করিমের এমন প্রশংসা আমাকে প্রকাশক হিসাবে গর্বে অভিভূত করে দেয়। আবার পড়তে শুরু করেন তিনি। আরও আধঘণ্টা পড়েন, তারপর মুখ তুলে বললেন : ছেলেটাকে ডেকে নিয়ে আসেন, আমি তার কাছ থেকে ইতিহাস লেখার এমন অদ্ভুদ কৌশলটা শিখব।তিনি যে কৌশলে ইতিহাস লিখেছেন, সেটি আয়ত্তে আনা কঠিন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লেকচার দিয়ে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। মাঠ 
পর্যায়ে মাঠে থেকে কাজ করতে করতে তা জানতে হয়। তিনি কী আরও কোনো ইতিহাস লিখেছেন?লিখেছেন। হাতিয়ার ইতিহাস।হাতিয়ার উপর আমি কাজ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু একটা তথ্যও সংগ্রহ করতে পারিনি। এ ছেলে তো বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। যত তাড়াতাড়ি পারেন তাকে নিয়ে আসেন।নিয়ে আসব।ইতোমধ্যে চা এসে যায়।চায়ে ভিজিয়ে বিস্কুট খেতে খেতে ড করিম বললেন: এটি কেবল নামেই ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে এটি শুধু ইতিহাস নয়, বৈচিত্র্যহাস; ভূগোল, জনমিতি, ধর্ম, বিবর্তন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্রমবর্ণনা, জনজীবনে সমুদ্রের প্রভাব, শরণার্থী, প্রস্তর যুগ হতে বঙ্গযুগ- সব বিবরণ এমন নির্ভুল তথ্যসহকারে তুলে ধরেছেন, যা আমার পক্ষে এত চমৎকারভাবে সম্ভব হতো না কখনও।ছেলেটিকে নিয়ে আসুন। আমি তার সঙ্গে একটু কথা বলব, আমার শেষ ইতিহাসের কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।কয়েকটি বিষয়ে আটকে গেছি।
ড. আমীনকে, আমি করিম সাহেবের প্রশংসার কথা বলেছিলাম।তিনি খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ড. করিম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। এত বড় একজন জ্ঞানী আমার প্রশংসা করেছেন, এর চেয়ে মর্যাদার আর কী হতে পারে? কিন্তু আজ-কাল করে যাওয়া হয়নি। শেষপর্যন্ত ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুলাই ড. আবদুল করিম চিরদিনের জন্য আমাদের সাক্ষাতের বাইরে চলে যান। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।                                    

এখন ‘চকরিয়ার ইতিহাস’ বইটির প্রবল চাহিদা। লন্ডন, কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, জাপানসহ পৃথিবীর অনেক দেশে চকরিয়ার অনেক লোক আছে। তারা আমাকে ফোন করেন, ফোন করে বইটি পাঠানোর অনুরোধ করেন। পাঠানোর মতো বই আমার আর নেই। ড. আমীনকে বলেছিলাম, আরও কিছু প্রকাশ করার জন্য। তিনি বলেছেন, নতুন তথ্য সংযোজন করতে হবে। তিনি নানা কাজে ব্যস্ত, আমিও আগের মতো সময় দিতে পারছি না। তবে শীঘ্রি পরিবর্ধিত সংস্করণ বের করার পরিকল্পনা আছে। আমি গর্ব বোধ করি। এমন সম্মানজনক ও স্থায়ী কাজ আমার পক্ষে আর কখনও করা সম্ভব হবে না। বইটির মাঝে আমি বেঁচে থাকব। বেঁচে থাকবে বইটির লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন। যতদিন চকরিয়ার থাকবে, ততদিন আমরা চকরিয়ার স্মৃতি আমাদের কাজে অক্ষয় হয়ে থাকবে। মরণশীল মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! চকরিয়া আজ পূর্ণ ইতিহাসে ঋদ্ধ, সারাবিশ্বে চকরিয়ার ইতিহাস আমাদের ঐতিহ্যকে আলোর মতো অফুরন্ত জ্ঞানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই আমি মনে আমার প্রকাশনায় প্রকাশিত ও ড. মোহাম্মদ আমীনের লিখিত চকরিয়ার ইতিহাস চকরিয়াবাসীর ‘ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদা’ অনিবার্য প্রতীক।

ড. মোহাম্মদ আমীন নিভৃত সাধক / ড. রচনা ব্যানার্জী

অনেক মানুষ কম কাজ করেও বেশি পরিচিতি পায় আবার অনেকে প্রচুর কাজ করেও পরিচিতি পায় না। আমি এখানে তেমন একজন লোকের কথা লিখছি। যার সঙ্গে কথা বললে মনে হবে, আপনি একজন শিশুর সঙ্গে কথা বলছেন। অথচ আমার দেখা কয়েকজন মেধাবী ব্যক্তির মধ্যে তিনি অন্যতম। মানুষ কীভাবে এত সহজ ও এত সরল হয়, তাঁকে না-দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর। অথচ তিনি এত মেধাবী যে, যে কোনো বিষয়ের উপর , বলা যায় কোনো সময়ক্ষেপণ ছাড়া, বিশাল গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখে দেওয়ার মতো অলৌকিক ক্ষমতা রাখেন। যদিও আমি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করি না। তার নাম ড.
মোহাম্মদ আমীন। পরিসংখ্যানের ছাত্র কিন্তু পিএইচডি করেছেন ওয়ার ক্রাইমে। প্রথমে ছিলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এমএস করেছেন সমাজ ও পরিবার বিজ্ঞানে, বিশেষ ডিগ্রি নিয়েছেন বাংলায়। পরিসংখ্যানের ছাত্র হলেও বাংলা বানান বিষয়ে তার মতো দক্ষ বাংলাভাষীর সংখ্যা হাতেগুণে বলে দেওয়া যায়। আমি বাংলার অধ্যাপক হলেও, তার কাছে অনেক শব্দের বানান ফোন করে জেনে নিই। জেনে নিই- কেন শব্দের বানান এমন! তিনি বলে দেন, জলের মতো পরিষ্কার করে। আর ভুলি না, ভুল হয় না। বিশেষ করে, ‘এমন কি’, ‘এমন কী’ এবং ‘এমনকি’ কথার বানান, ব্যবহার ও প্রয়োগ বলতে গেলে আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি। আগেও শিখলেও এত জটিল ছিল যে, মনে রাখতে পারতাম না।
ড. মোহাম্মদ আমীন একজন অসাধারণ ইতিহাস রচয়িতা। আঞ্চলিক ইতিহাসে তিনি যেমন নিগুঢ় তেমনি বিচক্ষণ। নামকরণের মাধ্যমে কীভাবে প্রকৃত ইতিহাসকে টেনে তুলে আনা যায় আবার কীভাবে ইতিহাসের মাধ্যমে নামকরণ বৃত্তান্তকে স্পষ্ঠীকরণ করা যায়- তা, তাঁর ইতিহাসবিষয়ক বইগুলো না-পড়লে বোঝা যাবে না। বিশেষ করে তার লেখা, ‘বাংলাদেশের জেলা উপজেলা ও নদনদীর নামকরণের  
ইতিহাস, তিলোত্তমা হাতিয়া : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, চকরিয়ার ইতিহাস ও অভয়নগরের ইতিহাস  প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। তার চকরিয়ার ইতিহাস পড়ে বিশ্বের বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আবদুল করিম আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন : ছেলেটিকে ডেকে নিয়ে আসেন, আমি তার কাছ থেকে ইতিহাস লেখা শিখব।’ চকরিয়ার ইতিহাস গ্রন্থের প্রকাশক আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেনের কাছে আমি এ গল্পটি শোনার সুযোগ পেয়েছি। তিনি ‘চকরিয়ার ইতিহাস’ নিয়ে ড. আবদুল করিমের কাছে গেলে’ ড করিম এমন উচ্ছ্বসিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে তিনি এমন সব জায়গার ইতিহাস লিখেছেন, যেসব স্থানের ইতিহাস আগে কেউ লিখেননি বা লিখতে পারেননি।
ড. মোহাম্মদ আমীন একজন প্রাবন্ধিক, ইতিহাসবেত্তা, গবেষক, জীবনীকার, ঔপন্যাসিক, রম্যরচয়িতা, গাল্পিক, বাংলা ভাষা বিশারদ। এতগুণ থাকা সত্ত্বেও  তিনি অত্যন্ত প্রচারবিমুখ। শুধু বাংলাদেশ নয়, তাঁর নিজ উপজেলা চন্দনাইশেরও অনেক লোকও জানেন না, ড. মোহাম্মদ আমীন নামের একজন আন্তর্জাতিক মানের লেখক তাদের উপজেলায় রয়েছে।  এটি আমার কাছে অবাক মনে হয় না, কারণ প্রাচীনকাল হতে জেনে আসছি, গায়ের যোগী ভিখ পায় না। তিনি গায়ের সমাদর না-পান, আন্তর্জাতিক মহল তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। পেয়েছেন আমেরিকা, ভারত, ইউরোপ প্রভৃতি দেশ হতে স্বীকৃতি। অধিকন্তু জীবিত অবস্থায় কাউকে সম্মানিত করতে বাঙালি বড় কুণ্ঠিত। ড. আমীনের পিতামহের ছোট ভাই আহমদ হোসেন একজন বীরপ্রতীক। তাঁকেও চন্দনাইশের অনেকে চেনেন না।
দেশের মানুষ না-চিনলেও চন্দনাইশ উপজেলার এ প্রচারবিমুখ ব্যক্তির প্রতিভাকে খুঁজে নিয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল হিস্ট্রি এসোসিয়েন’।  বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অধিবাসী ড. মোহাম্মদ আমীনকে  সুদূর ইউরোপের মেসেডোনিয়া থেকে ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল হিস্ট্রি এসোসিয়েশন’প্রদত্ত সম্মানজনক “ হেরিডোটাস, ফাদার অব দ্যা হিস্ট্রিঅ্যাওয়ার্ড, ২০১৫” প্রদান করা হয়েছে। এটি অনেক বড় বিষয়। অথচ একথাটাও তিনি কাউকে বলেননি।  ইন্টারনেট এবং তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে ইন্টারন্যাশনাল রেজিওনাল হিস্ট্রি এসোসিয়েন’ড. মোহাম্মদ আমীন ও তাঁর কৃতিত্বের খোঁজ পান বলে সংগঠনের কাছ থেকে জানা যায়। 
এটি একটি অত্যন্ত সম্মানজনক পুরস্কার। ড আমীনের নিকট পুরস্কার কোনো বিষয় না। তিনি কোনো পুরস্কারের আশা করেন না।  প্রতিবছর সারা বিশ্বে ১০৩ জনকে এ পদক প্রদান করা হয়। আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় অবদানের জন্য ড. মোহাম্মদ আমীনকে এ পুরুস্কারে ভূষিত করা হয়। বর্তমানে তিনি Impact of Biodiversity on human activities' শিরোনামের একটি গবেষণা করছেন। এজন্য তিনি ব্রাজিল, পেরু, চিলি, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর এবং সংলগ্ন আমাজন জঙ্গল নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেন।
ড. মোহাম্মদ আমীন এ পর্যন্ত অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু কাউকে বলেননি। তার পুরস্কারসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাজা রাম মোহন রায় পর্ষদ প্রদত্ত বঙ্গভূষণ পদক, নিউইয়র্ক থেকে পাওয়া ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ অ্যাওয়ার্ড, হেরিডোটাস, ফাদার অব দ্যা হিস্ট্রিঅ্যাওয়ার্ড, কবি নজরুল পদক, মহাত্মাগান্ধী পুরস্কারসহ  আরও অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন।
ড. মোহাম্মদ আমীন চন্দনাইশ উপজেলার চন্দনাইশ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নুরুল ইসলাম, মায়ের নাম সকিনা বেগম এবং পিতামহ ছিলেন প্রখ্যাত পির মৌলানা গোলাম শরীফ| স্ত্রীর নাম চয়নিকা জাহান চৌধুরী। প্রথম সন্তানের নাম এসএম আবীর চৌধুরী এবং দ্বিতীয় সন্তানের নাম অনুসিন্থিয়া জাহান চৌধুরী। আমেরিকা থেকে পিএইচ ডি অর্জনকারী প্রচার-বিমুখ এ লেখকের গ্রন্থসংখ্যা ইতোমধ্যে ৭৪ অতিক্রম করেছে। তন্মধ্যে আমার জানা কয়েকটির নাম নিচে দেওয়া হলো।

১. জর্জ ওয়াশিংটন হতে বারাক ওবামা; 
২. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাতির পিতা; 
৩. ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ ; 
৪. হাসতে হাসতে বাংলা শেখা ; 
৫. বাংলা সাহিত্য ও ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ; 
৬. বাংলা বানান ও শব্দ চয়ন, 
৭. সহজ বাংলা উচ্চারণ;
৮. বাংলা সাহিত্যের অ আ ক খ; 
৯. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা; 
১০. আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী; 
১১. নন্দিত কান্না নিন্দিত হাসি ; 
১২. দুই রাজকুমারী ; 
১৩. রমণীয় পাঁচালী; 
১৪. খরগোশ ও কচ্ছপ; 
১৫. বদল বাড়ির ভূত; 
১৬. মানুষই সেরা; 
১৭. ছোটদের আন্তর্জাতিক দিবস ; 
১৮. অভয়নগরের ইতিহাস ; 
১৯. তিলোত্তমা হাতিয়া: ইতিহাস ও ঐতিহ্য; 
২০. চকরিয়ার ইতিহাস;
২১. ম্যাজিস্ট্রেসি ও আদেশনামা;
২২. বন মামলা দায়ের ও পরিচালনার কৌশল;
২৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আইন;
২৪. জল দুনিয়ার মানুষ;
২৫. বাংলা বানানে ভুল : কারণ ও প্রতিকার
২৬. সময়ের পরশ পাথর;
২৭. মোহনীয় নরক;
২৮. জেলা, উপজেলা ও নদ-নদীর নামকরণের ইতিহাস; 
২৯. বাংলা সাহিত্যে প্রশাসকদের ভূমিকা; 
৩০. রঙ্গরসে বাংলা বানান
৩১. বিড়ম্বনা
৩২. সায়েন্স ফিকশন কিউপ্রিট
৩৩. অফিস আদালতে বাংলা লেখার নিয়ম
৩৪. নিমক হারাম
৩৫. বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন
৩৬. মানুষ ও বিড়াল
৩৭. বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস
৩৮. বাংলা সাহিত্যে পুলিশের ভূমিকা
৩৯. ভূতঅঙ্কের জিরো থিয়োরি
৪০. দাপ্তরিক প্রমিত বাংলা বানা্ন নির্দেশিকা
৪১. ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স
৪২. মানুষ ও বিড়াল
৪৩. এ সমাজ
৪৪. Marriage, Love and woman.
৪৫. Role of Extra Judiciary organs to ensure effective Judiciary system.
৪৬. স্বপ্ন জড়ানো পাহাড়
৪৭. বাংলা সাহিত্যে প্রশাসক ইত্যাদি
৪৮. নন্দলালের তীর্থযাত্রা
৪৯. সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ১৯০-২০১২
৫০. বেত ভূতের ইন্তেকাল
৫১. বৈচিত্র্যময় তথ্যে সচিত্র নোবেল প্রাইজ
৫১. আন্তর্জাতিক দিবস (সচিত্র ও রঙিন)
৫২. রাজকীয় জীবন ও শারমেয় মরণ
৫৩. উল্টোদেশে নন্দ ঘোষ
৫৪. জামিন তত্ব ও রায়
৫৫. শুদ্ধ বানান চর্চা
৫৬. গদাই বাবুর তীর্থযাত্রা
৫৭. প্রশাসনের ভাইরাস
৫৮. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
৫৯. বঙ্গবন্ধুর বাণী
৬০. মামাল ও আইনি হয়রানি হতে নিষ্কৃতির উপায়
৬১. অলৌকিক মহিমা
৬২. মূল্যবোধ